ইমাম ইবনে হিশাম رحمه الله উহুদের যুদ্ধের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সংরক্ষণ করেছেন, যা অনেকেই উপেক্ষা করে থাকেন। যাদের মধ্যে একজন আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর ওপর আক্রমণ করে তাঁকে আহত করেছিল, তার নাম ছিল ʿআব্দুল্লাহ ইবনে শিহাব আল-যুহরী। সে নবি ﷺ-কে আঘাত করেছিল এবং তাঁর পবিত্র কপালে রক্তাক্ত জখম সৃষ্টি করেছিল।
উহুদের ময়দানে, সিরাহর ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও রক্তাক্ত মুহূর্তগুলোর একটিতে, সে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর শত্রুদের কাতারে দাঁড়িয়েছিল। অথচ সুবহানাল্লাহ—পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাকেই ইসলামের পথে হিদায়াত দেন। শুধু তাই নয়, যিনি একদিন আল্লাহর প্রিয়তম ﷺ-এর ওপর হাত তুলেছিল, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন এবং তাঁর বংশধারার মাধ্যমেই মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্নাহ সংরক্ষককে আবির্ভূত করলেন—
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে শিহাব আল–যুহরী আল–কুরাশি আল–মাদানী
(৫০–১২৪ হিজরি)
তিনি কুরাইশ গোত্রের বনু যুহরাহ শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন—যে শাখা থেকেই নবি ﷺ-এর মাতৃবংশ এসেছে।

সুন্নাহ অনুসন্ধানে অদম্য সাধক
ইমাম আল-যুহরী رحمه الله তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ সাহাবি ও তাবেঈদের এক নক্ষত্রমালার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে ছিলেন—
- সহল ইবনে সা‘দ আস-সাঈদী,
- আনাস ইবনে মালিক,
- ʿউরওয়া ইবনে যুবাইর,
- আব্বান ইবনে উসমান,
- ʿউবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা,
- ʿআলী ইবনে আল-হুসাইন যায়নুল আবিদীন,
- মুহাম্মদ ইবনে নু‘মান ইবনে বশীর,
- আব্দুল্লাহ ইবনে কা‘ব ইবনে মালিক,
- আস-সায়িব ইবনে ইয়াযীদ رضي الله عنهم أجمعين
তিনি আট বছর কাটিয়েছিলেন মহান তাবেঈ ইমাম সাঈদ ইবনে আল-মুসাইয়্যিব رحمه الله-এর সান্নিধ্যে—যিনি ছিলেন মদিনার সর্বসম্মত ফকীহ।
তিনি সরাসরি বর্ণনা গ্রহণ করেছেন আরও অনেকের কাছ থেকেও, যেমন—
আবু বকর আস-সিদ্দিক رضي الله عنه-এর নাতি থুমামাহ ইবনে আব্দুল্লাহ,
সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ (ইবনে উমরের পুত্রদ্বয়),
এবং ʿআলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে ʿআলী ইবনে আবি তালিব رضي الله عنه।
ইমাম আল-যুহরী কেবল আনুষ্ঠানিক মাজলিসে উপস্থিত থাকতেন না। সুন্নাহর প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে মদিনার গলিপথে গলিপথে ঘুরিয়ে বেড়াতে বাধ্য করেছিল। তিনি আনসারদের বাড়িতে বাড়িতে যেতেন—বয়স্কদের, এমনকি শিশুদের কাছেও জিজ্ঞেস করতেন, তারা নবি ﷺ-এর কথা, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনের কী কী স্মৃতি ধারণ করে রেখেছে।
তার জ্ঞানপিপাসা ছিল সীমাহীন, লিপিবদ্ধকরণ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, আর স্মরণশক্তি ছিল অবিচল ও নিখুঁত।
ইমাম আয-যাহাবী رحمه الله লিখেছেন—
“ইব্রাহিম ইবনে সা‘দ বলেন, আমি একবার আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম: ‘কোন দিক দিয়ে যুহরী আপনাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন?’
তিনি বললেন: ‘তিনি মাজলিসে সামনে দিক দিয়ে প্রবেশ করতেন, এবং সেখানে বৃদ্ধ-যুবক—এমন কেউ থাকত না যাকে তিনি প্রশ্ন করেননি। তিনি আনসারদের বাড়িতেও যেতেন—সেখানে নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু—কাউকেই প্রশ্ন না করে ছাড়তেন না; এমনকি ঘরের ভেতরের তরুণীদের কাছেও জানতে চেষ্টা করতেন।’”
(সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা’)
বর্ণিত আছে, ঘরে থাকাকালে তিনি নিজেকে বইপত্র দিয়ে ঘিরে রাখতেন। এ দৃশ্য দেখে তাঁর স্ত্রী একদিন বলেছিলেন,
“আল্লাহর কসম, এই বইগুলো আমার কাছে তিনজন সতীনের চেয়েও ভারী।”
(ওয়াফায়াত আল-আয়ান)
সুন্নাহ সংকলনের অগ্রদূত
উমাইয়া খলিফা ‘উমর ইবনে আব্দুল আজিজ’ رحمه الله (৯৯–১০১ হিজরি) যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাবেঈদের যুগ ক্ষীণ হয়ে আসছিল এবং জাল বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ছিল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন—রাষ্ট্রীয়ভাবে সুন্নাহ লিখিত আকারে সংরক্ষণের নির্দেশ।
ইমাম ইবনে সা‘দ رحمه الله লিখেছেন—
“ʿউমর ইবনে আব্দুল আজিজ আবু বকর ইবনে হাযমকে লিখলেন:
‘রাসূল ﷺ-এর হাদিস অনুসন্ধান করো এবং তা লিখে নাও; আমি জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়া ও আলিমদের মৃত্যুকে ভয় করি।’
এবং তিনি আল-যুহরীকেও নির্দেশ দেন সুন্নাহ সংকলনের জন্য।”
(আত-তাবাকাত আল-কুবরা)
ইমাম মালিক رحمه الله বলেছেন,
“প্রথম ব্যক্তি যিনি পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লিপিবদ্ধ করেন, তিনি হলেন ইবনে শিহাব আল-যুহরী।”
(তাযকিরাতুল হুফ্ফায)
ইমাম ইবনে আল-মাদিনী رحمه الله বলেছেন,
“যুহরী না থাকলে সুন্নাহর অধিকাংশই হারিয়ে যেত।”
(সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা’)
ইমামদের ইমাম
তার ছাত্রদের তালিকাই বলে দেয় তার মর্যাদা—
- ইমাম আওযাঈ,
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস,
- ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ,
- ইমাম লাইস ইবনে সা‘দ,
- ইমাম ইবনে জুরাইজ,
- ইমাম ইউনুস ইবনে ইয়াজিদ,
- ইমাম শু‘আইব ইবনে আবি হামযা,
- ইমাম আইয়ুব আস-সাখতিয়ানী।
এমনকি সিরাহ ও মাগাযির শ্রেষ্ঠ ইমামগণ—মূসা ইবনে উকবা, মা‘মার ইবনে রাশিদ ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক—তাঁরই শিষ্য ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই শিক্ষক, যাঁদের হাতে ইসলামী স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে।








No Comment! Be the first one.