মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ করে কথিত অন্তরগুরুর ইবাদতে লিপ্ত করার অভিনব প্রতারণার নাম হলো কোয়ান্টাম মেথড।
হতাশাগ্রস্থ মানুষকে সাময়িক প্রশান্তির সাগরে ভাসিয়ে এক কল্পিত দেহ ভ্রমনের নাম দেয়া হয়েছে Science of Living বা জীবনযাপনের বিজ্ঞান। তাদের স্লোগানগুলো খুবই আকর্ষণীয়। যেমন তারা বলে থাকে যে, মেডিটেশনের জন্য কোনো ধর্ম বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। আর কোয়ান্টাম প্রত্যেক ধর্ম বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে। এ যেন কোয়ান্টাম গুরুদের গোলাম বানানোর অভিনব কৌশল।
তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, মেডিটেশন বা ধ্যান কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এক্ষেত্রে তারা কুরআন মাজিদের কিছু আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করে থাকেন, মূলত কুরআন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা করে থাকেন। এ বিষয়ে আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
কোয়ান্টাম মেথডের একটি পঞ্চসূত্র আছে, এগুলো হলো, প্রশান্তি, সুস্বাস্থ্য, প্রাচুর্য, সুখী পরিবার ও ধ্যান (meditation)। কোয়ান্টাম মেথড তাওহিদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং স্পষ্ট শিরক। তাওহিদের বিশ্বাস পরিপূর্ণভাবে এক আল্লাহ কেন্দ্রিক, ইসলামের সকল ইবাদতের লক্ষ্য হলো আল্লাহর দাসত্ব ও রাসূল ﷺ -এর আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা ও পরকালে মুক্তি লাভ করা। পক্ষান্তরে, কোয়ান্টাম মেথড ধ্যানধারণার লক্ষ্য হলো অন্তরগুরু কেন্দ্রিক, যা আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে মানুষকে তাঁর প্রবৃত্তির দাসত্বে আবদ্ধ করে। প্রবৃত্তির অনুসারীদের ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,
أَرَءَيْتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَـٰهَهُۥ هَوَىٰهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا
“আপনি কি সেই লোকের বিষয়ে ভেবে দেখেছেন যে তাঁর নফসকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন?” [সূরা ফুরকান- ৪৩]
তারা বলেন ধ্যানের কথা তো কুরআন মাজিদেও উল্লেখ আছে, এক্ষেত্রে তারা সূরা আলে-ইমরানের একটি আয়াত দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন। আল্লাহ বলেন,
ٱلَّذِينَ يَذْكُرُونَ ٱللَّهَ قِيَـٰمًۭا وَقُعُودًۭا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِى خَلْقِ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَـٰذَا بَـٰطِلًۭا سُبْحَـٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ
যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহ্র স্মরণ করে এবং আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে, আর বলে, ‘হে আমাদের রব! আপনি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি অত্যন্ত পবিত্র, অতএব আপনি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করুন।’ [আলে-ইমরান – ১৯১]
এই আয়াতে يَتَفَكَّرُونَ (ইয়াতাফাক্কারুন) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যা আরবি শব্দ (تَفَقُّر )-তাফাক্কুর ( বা فِقْر )ফিক্র) থেকে এসেছে, যার অর্থ গভীর চিন্তা করা। কিন্তু এটাকে কখনো ধ্যান বলা যায় না। তারা নিজেদের সার্থে এই অর্থকে বিকৃত করেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এছাড়া মানুষকে উৎসাহিত করতে তারা অনেক সময় একটি হাদিস বলে থাকেন,
فِكْرَةُ سَاعَةٍ خَيْرٌ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سَنَةً
এক ঘণ্টা গবেষণা করা ষাট বছরের ইবাদতের থেকেও অতি উত্তম।
যেটি মূলত একটি (موضوع) জাল বা মিথ্যা হাদিস, যা রাসূল ﷺ কখনও বলেননি। মুহাদ্দিসগণ এই হাদিসকে জাল সাব্যস্ত করেছেন। তাছাড়া তারা আরও বলেন, নবি ﷺ হেরার গুহায় ওহি প্রাপ্তির পূর্বে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, সুতরাং ধ্যানের ফলাফল স্পষ্ট, তাই ধ্যান করতে হবে।
এ কথার প্রতিউত্তরে আমরা বলব যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ধ্যান করেননি বরং তিনি নিঃসঙ্গতা গ্রহণ করেছিলেন। ধ্যান আর নিঃসঙ্গতা (একাকিত্ব) দুটা ভিন্ন বিষয়। তাছাড়া এ ঘটনা কুরআন মাজিদ অবতীর্নের পূর্বের ঘটনা, তখনও কুরআন নাজিল হয়নি এবং তিনি নবুয়াত প্রাপ্ত হননি। আর এই ঘটনা তার জীবনে একবারই ঘটেছিল। নবুয়াত প্রাপ্তির পর নবি ﷺ হেরা গুহায় যাননি এবং আর কখনো নিঃসঙ্গতাও গ্রহণ করেননি। এমনকি সাহাবায়ে কেরামগণও কখনও এটি করেননি।
তবে এটা সঠিক যে, কুরআন সুন্নাহতে আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে গবেষণা, চিন্তা করার কথা বলা হয়েছে। তবে চিন্তা-গবেষণা আর প্রচলিত ধ্যান অবশ্যই এক জিনিস নয়। তারা বলেন, ‘সকল ধর্মই সত্য’। এর দলিল হিসেবে সূরা কাফিরুনের এই আয়াত উল্লেখ করেন,
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِىَ دِينِ
তোমাদের দীন তোমাদের, আর আমার দ্বীন আমার। [সূরা কাফিরুন- ০৬]
অর্থাৎ তারা বলতে চায়, আবু জাহেলের দ্বীনও সঠিক এবং মুহাম্মদ ﷺ এর দ্বীনও সঠিক। এধরণের অপব্যাখ্যা সাধারণত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিকরা ও তাদের অনুসারীরা করে থাকে। সূরা কাফিরুন নাজিলের প্রেক্ষাপট তো নিশ্চই জানা আছে, এই সূরাটি নাজিল হয়েছিল আল্লাহর প্রদত্ত দ্বীনে কোনো কম্প্রোমাইজ হবে না এই বলিষ্ঠ ঘোষণা দিয়ে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“নিশ্চই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনিত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে-ইমরান: ১৯]
ইসলামের মূল বক্তব্যই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। এই বক্তব্যের দ্বারা সকল মিথ্যা ধর্ম ও মতবাদকে অস্বীকার করা হয়েছে, কোয়ান্টাম অন্তরগুরুও এর অন্তর্ভুক্ত।
তারা বলেন, মনকে প্রশান্ত করার মত সালাত যেন আপনি পড়তে পারেন সেজন্য মেডিটেশন প্রয়োজন। কেননা সালাতে একাগ্রতা, হুজুরি ক্বলব খুবই জরুরি, যা অর্জিত হয় মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে।
এর উত্তর হচ্ছে, সালাতে একাগ্রতা, খুশু-খুজু সবই আছে। অর্থাৎ অন্তরের প্রশান্তি, চোখের শীতলতা, সব কিছু সালাতের মাঝেই আছে, সালাতের মাধ্যমেই এসব অর্জন করতে হবে। এর বাহিরে অন্য কিছুর অনুমোদন ইসলামে নেই। আল্লাহ বলেন,
وَ اَقِمِ الصَّلٰوۃَ لِذِكۡرِیۡ
এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। [সূরা ত্বহা: ১৪]
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সংকটে পড়তেন তখন সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। [আবু দাউদ: ১৩১৯] আর সালাতে ধ্যান করা হয় না বরং বান্দা একান্তে তাঁর রবের সাথে আলাপ করেন। [বুখারি: ৫৩১]
সালাত হচ্ছে আল্লাহর গোলামি করা, আর এটিই হচ্ছে তাওহিদ, অন্যদিকে ধ্যান হচ্ছে অন্তরগুরু কেন্দ্রিক যা শিরক।
তারা আরও বলেন, শিথিলায়ন প্রক্রিয়ায় মানুষের মাঝে এমন এক ক্ষমতা তৈরি হয়, যার দ্বারা সে নিজেই, নিজের চাওয়া পাওয়া পূর্ণ করতে পারে। এজন্য একটা গল্প বর্ণনা করা হয় যে, এক ইঞ্জিনিয়ার স্বপরিবারে আমেরিকায় বসবাস করার মনছবি দেখতে লাগল, ফলে সে ডিভি ভিসা পেয়ে গেল। তারপর সেখানে একটা ভালো চাকরির জন্য মনছবি দেখতে লাগল, ফলেসে সেখানে যওয়ার দেড় মাসের মাথায় একটা ভালো চাকরি পেয়ে গেল। [টেক্সট বুক, পৃ: ১১৫]
এটা মূলত মনছবির পূজা ছাড়া কিছুই নয়, ইসলাম মানুষকে তাকদিরের ভরসা ও বিশ্বাস করার পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টার কথা শিক্ষা দেয়। আমি চেষ্টা করব কিন্তু ফলাফল তাকদিরের উপর নির্ভর করবে।
তারা বলেন, কোয়ান্টামের মতে রোগের মূল কারণ হলো মানসিক সমস্যা। তাই সেখানে মনছবি বা ইমেজ থেরাপি ছাড়াও দেহের ভিতর ভ্রমণ নামক পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরে নানা অঙ্গের মধ্যে দিয়ে কাল্পনিক ভ্রমণ করতে বলা হয়। এতে সে তাঁর সমস্যার স্বরূপ সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে এবং নিজেই কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। যেমন, একজন ক্যান্সার রোগী তাঁর ক্যান্সারের কোষগুলোকে সরিষার দানা রূপে কল্পনা করে। আর দেখে যে অসংখ্য ছোট ছোট পাখি ঐ সরিষাদানাগুলো খেয়ে নিচ্ছে। এভাবে আস্তে আস্তে সর্ষে দানাও শেষ, তাঁর ক্যান্সারও শেষ।
এটা মূলত সুফিবাদের কাশফের মত যদি ধ্যান করে কল্পনা জগতে প্রবেশ করে সবকিছু দেখা সম্ভব হতো তাহলে তো ডাক্তার দেখানো ও পরীক্ষানিরীক্ষা করার কোনো প্রয়োজনই নেই।
তারা বলেন, ৩০ পারা সূরা বুরুজে বুরুজ অর্থ— ‘রাশি চক্র’। এজন্য ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ নির্ধারণের বিষয়টি তাদের শিষ্যদের অন্তরে গেথে দেয়া হয়। অথচ, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইবনে আব্বাস رضي الله عنه – বুরুজের অর্থ করেছেন, তারকারাজি।
রাশিচক্র দিয়ে কল্যাণ-অকল্যাণ, শুভ-অশুভ নির্ধারণ করা মুশরিকদের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এসব করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি রাশিচক্র বিশ্বাস করে গণকের কাছে যায় তাঁর ৪০ দিনের সালাত কবুল হবে না। আর সে নবি ﷺ এর আনিত বিধানকে অস্বীকারকারী। [মুসলিম, মিশকাত: ৪৫৯৫]
প্রিয় পাঠক, এভাবেই আরও অসংখ্য কুরআনের আয়াত ও হাদিসকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে তারা সাধারণ শিক্ষিত মানুষদের বিভ্রান্ত করে থাকে। যা সঠিক ব্যাখ্যা জানা ব্যতিত বুঝা খুবই কঠিন। আল্লাহ যেন মুসলিম উম্মাহকে সকল বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেন। আমীন।








No Comment! Be the first one.