কুরআনে নবি আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর সৃষ্টি এবং তাঁর পুত্র হাবিল (Abel) ও কাবিলের (Cain) পরীক্ষার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তারা এক বিশেষ সুন্দরী নারীকে বিয়ে করার বিষয় নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়। আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ তাদের উভয়কে কুরবানি পেশ করার নির্দেশ দেন এবং যার কুরবানি কবুল হবে, তাকেই যোগ্য পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হবে। হাবিলের কুরবানি কবুল হয়েছিল, কারণ সে তার সর্বোত্তম সম্পদ থেকে কুরবানি করেছিল এবং সে ছিল আন্তরিক ও ধার্মিক। অন্যদিকে, কাবিলের কুরবানি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, কারণ সে তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিসটি বেছে নিয়েছিল এবং তার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা ছিল না। হিংসায় জর্জরিত হয়ে কাবিল হাবিলকে হত্যা করার হুমকি দেয়। হাবিলের শান্তিপূর্ণ আচরণ এবং এই ধরনের পাপের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা সত্ত্বেও কাবিল তাকে হত্যা করে।
এটি ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম হত্যাকাণ্ড এবং আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর সন্তানদের মধ্যে ধার্মিকতা থেকে প্রথম বড় বিচ্যুতি। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,
لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الْأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا، لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ
“যেকোনো প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে, এর পাপের একটি অংশ আদমের প্রথম সন্তানের ওপর বর্তাবে, কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার প্রচলন করেছিল।” [তিরমিজি]
হাবিলের মৃত্যু নবি আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-কে গভীর দুঃখে নিমজ্জিত করে। অবশেষে আল্লাহ তাঁকে শীষ (Seth) عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ নামে আরেক পুত্র সন্তান দান করেন। কুরআন বা সহিহ সুন্নাহ থেকে আমরা নবি শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, তার সবই ইসরাইলি বর্ণনা থেকে নেওয়া। কথিত আছে যে, নবি আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর বংশধররা প্রাথমিকভাবে ফিলিস্তিন ও শাম অঞ্চলে বসবাস করত এবং শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ তাদের পথপ্রদর্শন করতেন, যিনি তাঁর পিতার পর একত্ববাদের বার্তা বহন করেছিলেন। নবি আদম عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর মৃত্যুর পর, তাঁর ধার্মিক পুত্র নবি শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-কে আল্লাহ মানবজাতির জন্য ঐশী নির্দেশনা অব্যাহত রাখতে এবং আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের পথে পরিচালিত করার জন্য মনোনীত করেন। তিনি তাদের মানবজাতির সূচনা, শয়তানের প্রতারণা এবং কীভাবে তার কারণে তারা জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, সে সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি এবং তাঁর বংশধররা তাদের তাকওয়া ও ধার্মিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তারা পাহাড়ে বসবাস করতেন এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলতেন।
অন্যদিকে, কাবিল (Cain), যে হিংসার বশবর্তী হয়ে তার ভাই হাবিলকে (Abel) হত্যা করেছিল, সে তার বংশধরদের নিয়ে সমতল ভূমিতে চলে যায় এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করে। শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর ধার্মিক বংশের বিপরীতে কাবিলের বংশধররা তাদের বিদ্রোহী মনোভাব, পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকা এবং আল্লাহর অবাধ্যতার জন্য পরিচিত ছিল। তারা ধীরে ধীরে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরে যায় এবং অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।
শয়তান একজন তরুণ শিক্ষানবিশ হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে এবং নিজেকে শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর অনুসারীদের দলত্যাগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে এক কামারের কাছে কাজ নেয়। সেখানে সে একটি বাঁশি এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে, যা কাবিলের লোকদের আকৃষ্ট করে। সে সবার জন্য তা বাজাত এবং তারা এর আগে এমন কিছু শোনেনি। এটি ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন শব্দ, কারণ এর আগে কোনো সঙ্গীতের অস্তিত্ব ছিল না। এরপর সে একটি ছোট ঢোল তৈরি করে এবং তা বাজাতে শুরু করে, যা সবাইকে অবাক করে দেয়। যখন সে বাজাত, তখন লোকেরা তার চারপাশে জড়ো হতো। কথিত আছে, শয়তান যখন বাঁশি বাজাত, তখন তারা সেই শব্দের তালে তালে তাদের শরীর দোলাতে শুরু করত। সে তাদের শিখিয়েছিল কীভাবে ঢোল ও বাঁশিসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে হয়। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো শয়তানকে তাদের ওপর ক্ষমতা প্রদান করে এবং তারা গান-বাজনা ও নাচের জন্য দিন-রাত নির্ধারণ করতে শুরু করে। তারা গান, নাচ এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রথম উৎসবের আয়োজন করে, যা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ তৈরি করে। এটিই ছিল প্রথমবার, যখন সঙ্গীতকে দুর্নীতি, কামনা-বাসনা জাগ্রত করা এবং লজ্জার বাঁধ ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর ধার্মিক বংশের নারীরা তাদের লজ্জা ও সতীত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন। তারা নিজেদের শালীনভাবে আবৃত করে রাখতেন এবং পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এমন কোনো সাজসজ্জা করতেন না। কিন্তু কাবিলের বংশের নারীরা নিজেদের সাজাতে শুরু করে, মেকআপ ব্যবহার করে, খোলামেলা পোশাক পরে এবং পুরুষদের প্রলুব্ধ করার জন্য নিজেদের কণ্ঠকে আকর্ষণীয় করে তোলে। শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দেয় যে, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে, তবে তারা পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, যা ব্যাপক ফিতনার কারণ হয়।
প্রাথমিকভাবে, শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর ধার্মিক সম্প্রদায় এবং কাবিলের দুর্নীতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বিভেদ ছিল। শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর লোকেরা (ধার্মিকরা) পাহাড়ে বাস করত, আর কাবিলের লোকেরা বাস করত সমতল ভূমিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা পৃথক ছিল—যতদিন না শয়তান শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর বংশের এক ব্যক্তিকে প্রতারিত করে। শয়তান তাকে সরাসরি এসে গান শুনতে বলেনি। বরং, সে তার মনে সন্দেহ তৈরি করার মাধ্যমে এটি শুরু করে। লোকেরা শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-কে প্রশ্ন করতে শুরু করে যে, কেন তাদের উপত্যকায় নামতে দেওয়া হয় না। শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ তাদের ব্যাখ্যা করেন যে, আল্লাহ তাদের সেখানে যেতে নিষেধ করেছেন এবং হাবিল ও কাবিলের ঘটনা বর্ণনা করেন। তা সত্ত্বেও, শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর বংশের এক যুবক নিচ থেকে আসা সঙ্গীতের শব্দ শুনে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। সে কাবিলের লোকদের সাথে মেলামেশা নিষিদ্ধ করার পেছনের কারণটি নিজে থেকে জানতে চেয়েছিল। সে পাহাড় থেকে নেমে কাবিলের লোকদের দেশে আসে এবং সেখানে সে নারীদের সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে নাচতে দেখে। সে মুগ্ধ হয়ে যায় এবং শীঘ্রই তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর শিক্ষা ভুলে যায়। এরপর অন্য পুরুষরাও তাকে অনুসরণ করে এবং এভাবেই আদমের ধার্মিক বংশধরদের মধ্যে প্রথম নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়। শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর বংশের পুরুষরা, যারা কখনো নারীদের এমন খোলামেলাভাবে সৌন্দর্য প্রদর্শন করতে দেখেনি, তারা মোহিত ও বিমুগ্ধ হয়ে পড়ে। এই অবাধ মেলামেশা ও প্রলোভনের ফলেই প্রথম ব্যভিচার ও যিনা (zina) সংঘটিত হয়।
যখন নবি শীষ عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ দেখলেন যে তাঁর লোকেরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, তখন তিনি তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। কিন্তু ততদিনে অনেকেই প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিল। ধার্মিকরা এখন দুনিয়ার প্রলোভনে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
আল্লাহ কুরআনে শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে আমাদের বলেন,
وَٱسْتَفْزِزْ مَنِ ٱسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِى ٱلْأَمْوَٰلِ وَٱلْأَوْلَـٰدِ وَعِدْهُمْ ۚ وَمَا يَعِدُهُمُ ٱلشَّيْطَـٰنُ إِلَّا غُرُورًا
“তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো তাকে পথভ্রষ্ট করো, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালাও, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হও এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দাও। শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা ছাড়া আর কিছুই নয়।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৬৪]
وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشْتَرِى لَهْوَ ٱلْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍۢ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌۭ مُهِينٌۭ
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যে অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য ‘লাহওয়াল হাদিস’ (বিনোদনমূলক কথা বা গান-বাজনা) ক্রয় করে এবং আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৬]
ইমাম কাতাদা বলেন, “আল্লাহর কসম, সে হয়তো এর জন্য অর্থ ব্যয় করে না, কিন্তু তার ‘ক্রয়’ করার অর্থ হলো সে এটি পছন্দ করে, এবং সে যত বেশি পথভ্রষ্ট হয়, তত বেশি এটি পছন্দ করে এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যাকে এবং উপকারী জিনিসের চেয়ে ক্ষতিকর জিনিসকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।” [তাফসির ইবনে কাসির]
এ থেকে আমরা যা শিখতে পারি:
- এই গল্পে যে ধারাটি দেখা যায় তা ইতিহাস জুড়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সঙ্গীত এবং অনৈতিক সমাবেশ প্রায়শই নির্লজ্জতার দিকে পরিচালিত করে।
- শয়তান তাদের সরাসরি যিনা করার কথা বলেনি—সে প্রথমে সঙ্গীত, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং অবাধ মেলামেশার প্রচলন করেছিল। সঙ্গীতকে পাপের প্রতি হৃদয়কে নরম করতে এবং অনৈতিক কাজকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
- ধার্মিক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ একটি ঐশী সুরক্ষা ছিল, কিন্তু যখন সেই বাধা ভেঙে দেওয়া হয়, তখন ফিতনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ইমাম ইবনে কাসির رحمه الله বলেন, “আদমের মৃত্যুর পর শীষ তাঁর জাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন, অন্যদিকে কাবিলের বংশধররা আরও বেশি পাপে লিপ্ত হয়। শয়তান নারীদের মধ্যে গান-বাজনা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্রবর্তন করে, যা প্রথম অনৈতিক কার্যকলাপের দিকে পরিচালিত করে।” [আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া]
ইমাম আত-তাবারি رحمه الله তাঁর ‘তারিখ আল-উমাম ওয়াল-মুলুক’ গ্রন্থে একই ধরনের একটি বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে তিনি আলোচনা করেছেন কীভাবে কাবিলের বংশধরদের দুর্নীতির দিকে পরিচালিত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “যখন কাবিলের লোকেরা আদম ও শীষের পথ ত্যাগ করে, তখন তারা গান-বাজনা, নাচ এবং সৌন্দর্য প্রদর্শনে লিপ্ত হয়, যা অবাধ মেলামেশা ও অনৈতিকতার দিকে পরিচালিত করে।”
তাফসির আত-তাবারিতে তিনি প্রাথমিক কিছু বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে শয়তান দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের মধ্যে বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন করেছিল। তিনি বলেন, “শয়তানই প্রথম বাঁশি তৈরি করে এবং লোকদের সমাবেশে সেগুলো ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে।”
ইমাম ইবনুল জাওযি رحمه الله বর্ণনা করেন, “শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশলগুলোর মধ্যে একটি ছিল সঙ্গীত ও বিনোদনের প্রচলন করা, যাতে মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। এটি প্রথম কাবিলের লোকদের মধ্যে দেখা গিয়েছিল, যারা ভোগ-বিলাসে মগ্ন হয়ে পড়েছিল, যা তাদের আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল।” [তালবিসু ইবলিস]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম رحمه الله বর্ণনা করেন, “যিনার (ব্যভিচার) প্রথম ঘটনা ঘটেছিল সঙ্গীত এবং নারীদের মধ্যে সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্রচলনের পর, যা শয়তান কাবিলের লোকদের শিখিয়েছিল।” [ইগাসাতুল লাহফান]








No Comment! Be the first one.