মুহাররাম মাস: হিজরতের বার্তা ও দ্বীনের বিজয়
মুহাররাম মাস আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ ﷺ -এর মক্কা থেকে মাদীনায় হিজরতকে স্মরণ করিয়ে দেয় — যেটি এক নতুন সূচনা — ইসলামের গৌরবের পথে যাত্রা।
এই মাসটি সেই সময়কেও স্মরণ করিয়ে দেয় যখন আল্লাহ মূসা عليه السلام এবং তাঁর কওমকে সাহায্য করেছিলেন, যখন ফেরাউন তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে এক অসম্ভব ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। সামনে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু (নীল নদ), পেছনেও ছিল ধ্বংস (ফিরআউনের বাহিনী) — সব আশা শেষ হয়ে হতাশা ছেয়ে গিয়েছিল। তখন ঘটেছিল অসম্ভব এক ঘটনা, আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছিল; কেননা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো মিথ্যা হয় না বা দেরিতে আসে না — তা আসে নিখুঁত সময়ে। এমন এক পথ খুলে গিয়েছিল যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু আল্লাহর জন্য এটি তো কেবল, “كُنْ فَيَكُونُ“ — “হয়ে যাও” — এবং তা হয়ে যায়।
সাহাবাগণ তাদের সবকিছু ত্যাগ করে নবি ﷺ-কে অনুসরণ করেছিলেন, যেমন বনি ইসরাইল মূসা عليه السلام -কে অনুসরণ করেছিল। এই দুই দলের মধ্যকার পার্থক্য এবং তাদের সাফল্য বা ধ্বংসের কারণ ছিল তাদের নবির আদেশের প্রতি আনুগত্য।
যদিও সময় বদলে গেছে, মানুষ বদলে গেছে, যুগের ফেরাউন বদলে গেছে — কিন্তু আল্লাহ আজও সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী। যদি তাওয়াক্কুল (আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা) লোহিত সাগরকে বিভক্ত করতে পারে, তাহলে আমাদের সমস্যাগুলো আসলে কত বড়?
রাসূলুল্লাহ ﷺ মুহাররাম মাসকে “আল্লাহর মাস” বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহর প্রতি এই নামকরণ তার মর্যাদা নির্দেশ করে, কারণ আল্লাহ কেবল তাঁর বিশেষ সৃষ্টিকেই নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। যেমন তিনি মুহাম্মদ, ইব্রাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব عليهم السلام -কে তাঁর এবাদতের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। তেমনি কা‘বাকে “আল্লাহর ঘর” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভাষাগতভাবে, মুহাররাম মানে “নিষিদ্ধ”; একে মুহাররাম বলা হয়েছে কারণ এ মাসে সব ধরনের যুদ্ধ, সহিংসতা ও আগ্রাসন নিষিদ্ধ ছিল এবং এটি চারটি পবিত্র মাসের অন্তর্ভুক্ত।
মুহাররাম কী?
মুহাররাম মাস হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি পবিত্র মাসের অন্যতম, যেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ...
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারো, যা আল্লাহর কিতাবে রয়েছে, সেদিন থেকে যেদিন তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; তার মধ্যে চারটি পবিত্র। এটাই সরল দ্বীন। অতএব, এই মাসগুলিতে নিজেদের উপর জুলুম করো না…” [সূরা আত-তাওবাহ, ৩৬]
ইবনে আব্বাস رضي الله عنهما বলেন, এই বাক্যটি — “সুতরাং এই মাসগুলোতে নিজেদের উপর জুলুম করো না…” — সব মাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কিন্তু এই চারটি মাসকে আলাদা করে পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে এই মাসে গুনাহ আরো গুরুতর হয়ে যায় এবং নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
যেমন ধরুন, কেউ যদি কোনো অফারের সময় অথবা নতুন আইফোনের লঞ্চ উপলক্ষে পাগলের মতো লাইনে দাঁড়ায়, কয়েক ঘন্টা সময় নষ্ট করে এবং একটি মোবাইলের জন্য এত টাকা ব্যয় করে — যা দিয়ে অসংখ্য গরিব পরিবারকে খাওয়ানো যেত। আমরা বলছি না যে এটা হারাম বা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত উপভোগ করা যাবে না।
আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে — মুহাররাম মাসও এক ধরনের অফার, যা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। এই মাসে আমাদের উচিত যতটা সম্ভব নেক আমল করে নেয়া। আল্লাহর রহমত ও প্রতিদান এই মাসে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়। আমরা যত বেশি ইবাদত করবো, আল্লাহ আমাদের মর্যাদা বাড়াবেন এবং এটা এমন এক প্রমোশনাল অফার যা আমরা কোনোভাবেই মিস করতে পারি না। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, যদি আপনি অন্যদের এই অফারের কথা জানান এবং তারা আমল করে, তাহলে তাদের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব আপনি নিজেও পাবেন — যেন আপনি নিজেই তা করেছেন। কত দারুণ না?
একইসাথে আমাদের গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে হবে, কারণ এই মাসে গুনাহের শাস্তিও বেড়ে যায়।
ইমাম আল-ইজ্জ ইবনে আবদুস সালাম رحمه الله বলেন, “আল্লাহ নির্দিষ্ট কিছু সময় ও স্থানকে পবিত্র বা বরকতময় করেছেন, যাতে তাঁর বান্দারা তাতে নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত হয় এবং তার জন্য অধিক সওয়াব অর্জন করতে পারে।” [কাওয়াইদুল আহকাম]
তিনিই আমাদের রব, পরম দয়ালু, সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। আমরা জানি হিজরি বর্ষপঞ্জি হিজরতের উপর নির্ভর করে স্থাপন হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন আসে — হিজরত তো রবিউল আউয়ালে হয়েছিল, তাহলে মুহাররাম কীভাবে বছরের প্রথম মাস হলো?
হিজরি পঞ্জিকা
জনপ্রিয় ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জুলিয়ান ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার ১লা জানুয়ারিকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারণ করেন, কারণ ‘জেনাস’ প্রতীকীভাবে নতুন বছরের দরজা নির্দেশ করে। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সংশোধন হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন।
ইমাম ইবনে হাজার, ইমাম আল-হাকিম, এবং ইমাম ইবনে কাসীরসহ বহু আলিম হিজরি ক্যালেন্ডারের সূচনা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
সাহাবাদের সময়ে বিভিন্ন ক্যালেন্ডার একসাথে ব্যবহৃত হতো। বর্ণিত হয়েছে যে, পারস্যের সাসানীয়রা তাদের পঞ্জিকা শুরু করেছিল ১৬ই জুন, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে—যেদিন তৃতীয় ইয়াজদাজির্দ সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন সিরিয়া অঞ্চলে ব্যবহৃত হতো রোমান ‘জুলিয়ান’ ক্যালেন্ডার, যার সূচনা ৩১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১লা অক্টোবর। মিসরের লোকেরা ব্যবহার করত কপটিক ক্যালেন্ডার, যার সূচনা হয়েছিল ২৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে আগস্ট থেকে।
ইমাম যুহরি ও ইমাম তাবারি বর্ণনা করেন যে, নবি ﷺ যখন রবিউল আউয়াল মাসে মাদীনায় আগমন করেন, তখন তিনি আদেশ দেন যেন যোগাযোগ ও অন্যান্য হিসাব-নিকাশ রবিউল আউয়াল মাসের ভিত্তিতে করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে নবি ﷺ একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতির নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
যা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত, তা হলো—সর্বপ্রথম হিজরি বর্ষ গণনার বিষয়টি উত্থাপন করেন উমর ইবনুল খাত্তাব رضي الله عنه, কারণ তার খিলাফতের সময় প্রচুর চিঠিপত্র আসত এবং তাদের তারিখ জানা প্রয়োজন ছিল।
দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই সিদ্ধান্তকে অনুপ্রাণিত করে। প্রথমটি ছিল একটি ঋণের পরিশোধ নিয়ে দ্বন্দ্ব। একজন ব্যক্তি বলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, এই ব্যক্তি শা‘বান মাসে আমার টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল এবং এখন তো রমাদান চলছে।” অন্য ব্যক্তি বলেন, “আমি শা‘বান বলেছিলাম, তবে সেটি আগামী বছরের শা‘বান বুঝিয়েছি।”
দ্বিতীয় ঘটনা: বসরার গভর্নর আবু মূসা আশ‘আরী رضي الله عنه একটি চিঠিতে লিখেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি যখন আমাদের কিছু করতে বলেন একটি নির্দিষ্ট মাসের মধ্যে, আমরা বুঝতে পারি না আপনি এই বছরের মাস বুঝিয়েছেন নাকি পরের বছরের।”
এই ঘটনা ঘটেছিল উমর رضي الله عنه -এর খিলাফতের চতুর্থ বছরে, অর্থাৎ ১৭ হিজরিতে (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ)। তার পূর্বে আরবদের রীতি ছিল বছরগুলোকে বিশেষ ঘটনাবলির নাম দিয়ে চিহ্নিত করা, যেমন: হাতির বছর, শোকের বছর ইত্যাদি।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-বিরুনি উল্লেখ করেন যে, মাদীনায় নবি ﷺ -এর দশ বছরের প্রতিটিই আলাদা নামে পরিচিত ছিল। সেগুলো হলো:
- ১ম বছর: অনুমতির বছর (সানাতুল ইধন)
- ২য় বছর: যুদ্ধের আদেশের বছর (সানাতুল আমর বিল কিতাল)
- ৩য় বছর: পরীক্ষার বছর (সানাতুত তামহিস)
- ৪র্থ বছর: নবদম্পতিদের শুভেচ্ছার বছর (সানাতুত তারফিয়া)
- ৫ম বছর: ভূমিকম্পের বছর (সানাতুয যালযালা)
- ৬ষ্ঠ বছর: অনুসন্ধানের বছর (সানাতুল ইসতিনাস)
- ৭ম বছর: বিজয়ের বছর (সানাতুল ইস্তিগলাব)
- ৮ম বছর: সমতার বছর (সানাতুল ইসতিওয়া)
- ৯ম বছর: মুক্তির বছর (সানাতুল বারা’আহ)
- ১০ম বছর: বিদায়ের বছর (সানাতুল ওদা‘)
এই ঘটনাভিত্তিক বর্ষ নামকরণ উমর رضي الله عنه -এর খিলাফতের সময় পর্যন্ত চলতে থাকে। [আছারুল বাকিয়া]
উমর رضي الله عنه -এর নিকট যে প্রস্তাবগুলো পেশ করা হয়েছিল হিজরি পঞ্জিকা শুরু করার জন্য তা হলো:
- পারস্যীয় ক্যালেন্ডার গ্রহণ করা।
- রোমান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করা।
- নবি ﷺ -এর ইন্তিকালের তারিখ থেকে শুরু করা।
- প্রথম ওহির তারিখ থেকে শুরু করা।
- মুসলিমদের হিজরতের তারিখ থেকে শুরু করা।
- নবি ﷺ -এর জন্মদিন থেকে শুরু করা।
উমর رضي الله عنه সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আলী ইবনে আবী তালিব رضي الله عنه হিজরতের তারিখ থেকে ক্যালেন্ডার শুরু করার প্রস্তাব দেন। উমর رضي الله عنه এই প্রস্তাবে সম্মত হন এবং ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করেন হিজরতের উপর ভিত্তি করে, কারণ হিজরতের তারিখটি সুপরিচিত ছিল এবং সাহাবাগণ এতে একমত হন।
উমর رضي الله عنه বলেন:
الهجرة فرَّقت بين الحق والباطل، فأرِّخوا بها
“হিজরত সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছে, তাই আমরা সেটাকেই তারিখ নির্ধারণের ভিত্তি বানাবো।” [তারিখ আত-তাবারী]
নবুয়তের একাদশ বছর অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দকে হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম বছর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
বর্ষ নির্ধারণের পর দেখা গেল, বছরের কোন মাসটি প্রথম হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। উসমান ইবনে আফফান رضي الله عنه প্রস্তাব দেন—“আমরা হজ থেকে ফিরে এসে নতুন করে হিসাব শুরু করি, সুতরাং জিলহজকে বছরের শেষ মাস হিসেবে নিন।” তাই মুহাররাম মাসকে বছরের প্রথম মাস করা হয়। আরেকটি কারণ আলেমরা উল্লেখ করেছেন যে, মুহাররাম মাসেই হিজরতের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল, আনসারগণ জিলহজ মাসে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। আর জাহিলি যুগেও মুহাররামকেই বছরের প্রথম মাস ধরা হতো।
শাইখ আব্দুল আজিজ আত-তারিফি حفظه الله বলেন:
“উমর رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ হিজরি ক্যালেন্ডার নবি ﷺ -এর জন্মের উপর নয় বরং হিজরতের উপর নির্ধারণ করেন, যেমন আহলুল কিতাবরা করে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে—আমরা ঘটনা-নির্ভর একটি জাতি নই বরং আমরা কর্মনির্ভর একটি উম্মত।”

হিজরি ক্যালেন্ডার ও মুহাররাম মাসে করণীয়
এটা জানা জরুরি যে, হিজরি ক্যালেন্ডার হলো চাঁদের ওপর ভিত্তিকৃত—অর্থাৎ চন্দ্র মাসের শুরু নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। প্রতিটি মাসে দিনের সংখ্যা হয় ২৯ বা ৩০ দিন। হিজরি ক্যালেন্ডারে ২৮ বা ৩১ দিনের কোনো মাস নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হিজরি ক্যালেন্ডারে নতুন ‘দিন’ শুরু হয় সূর্যাস্তের পর থেকে—মধ্যরাতের পর নয়। অর্থাৎ রাত দিনের আগে আসে।
আল্লাহ বলেন:
هُوَ ٱلَّذِى جَعَلَ ٱلشَّمْسَ ضِيَآءًۭ وَٱلْقَمَرَ نُورًۭا وَقَدَّرَهُۥ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا۟ عَدَدَ ٱلسِّنِينَ وَٱلْحِسَابَ ۚ مَا خَلَقَ ٱللَّهُ ذَٰلِكَ إِلَّا بِٱلْحَقِّ ۚ يُفَصِّلُ ٱلْـَٔايَـٰتِ لِقَوْمٍۢ يَعْلَمُونَ
“তিনিই সূর্যকে তীব্র আলো এবং চন্দ্রকে মৃদু আলো করেছেন এবং এর জন্য বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করেছেন, যেন তোমরা বছর গণনা ও হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ এটা কিছুই অমূলক সৃষ্টি করেননি। তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন এমন কওমের জন্য যারা জানে।” [সূরা ইউনুস, আয়াত ৫]
তাহলে মুহাররামে আমরা কী করতে পারি?
১. রোজা রাখা
ইবনে আব্বাস رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ যখন মাদীনায় আসলেন, তখন তিনি দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তারা বলল, “এটি সেই দিন যেদিন মূসা ফেরআউনের উপর বিজয়ী হয়েছিলেন।” তখন নবি ﷺ তাঁর সাহাবাগণকে বললেন, “তোমরা (মুসলমানরা) মূসার বিজয় উদযাপন করার জন্য তাদের তুলনায় অধিক হকদার। অতএব, তোমরাও এই দিনে রোজা রাখো।” [সহিহ বুখারী]
ইবনে আব্বাস رضي الله عنه বলেন, “আমি নবি ﷺ -কে কোনো দিন রোজার ব্যাপারে এত আগ্রহী হতে দেখিনি যতটা আশুরা এবং রমাদান মাসের ব্যাপারে ছিলেন।” [সহিহ বুখারী]
আবু হুরাইরা رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ বলেন, “রমাদানের পর রোজার জন্য সর্বোত্তম মাস হলো মুহাররাম, যা আল্লাহর মাস; এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ)।” [সহিহ মুসলিম]
ইমাম সুয়ুতি رحمه الله বলেন: “মুহাররাম মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে, কারণ জাহিলি যুগে অন্যান্য মাসের নাম থাকলেও মুহাররাম এর নাম ছিল ‘সফরুল আওয়াল‘, পরে তা ‘সফরুস সানি‘ হতো। ইসলাম এসে আল্লাহ এটিকে মুহাররাম নাম দেন, তাই এটি আল্লাহর দিকে সংযুক্ত হয়েছে।”
নবি ﷺ বলেন: “আশুরার দিনে রোজা রাখা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা।” [সহিহ মুসলিম]
ইবনে আব্বাস رضي الله عنه বলেন: নবি ﷺ বলেন, “যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, ইনশাআল্লাহ আমি মুহাররামের ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” [সহিহ মুসলিম]
আবু উসমান আন-নাহদি رحمه الله বলেন:
“সালাফ এবং তাবেঈগণ তিনটি দশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন: মুহাররামের প্রথম দশ দিন, যিলহজের প্রথম দশ দিন, এবং রমাদানের শেষ দশ দিন।” [আদ-দুরার আল-মানসুর]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম رحمه الله বলেন:
“আশুরার রোজার তিনটি স্তর রয়েছে:
১. পূর্ণতম: আশুরার একদিন আগে ও পরে রোজা রাখা (৯ম, ১০ম, ১১তম)
২. উত্তম: ৯ম ও ১০ম দিন রোজা রাখা
৩. সর্বনিম্ন: শুধু ১০ম তারিখে রোজা রাখা” [যাদুল মা‘আদ]
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি رحمه الله বলেন (ফাতহুল বারি):
আশুরার রোজার তিন স্তর—
১. শুধুমাত্র ১০ম দিন রোজা রাখা
২. ৯ম ও ১০ম দুই দিন রোজা রাখা
৩. ৯ম, ১০ম ও ১১তম—তিন দিন রোজা রাখা
কিছু আলেম ১১ তারিখে রোজার হাদিসগুলোকে দুর্বল বলেছেন, আবার অনেকে হাসান বলেছেন। ইমাম ইবনে হাজার নিজেই তিন দিন রোজার কথাই বলেছেন, যা এই আমলের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। একদিকে এটা ইহুদিদের সাথে মিল না রাখতে সাহায্য করে, আবার অন্যদিকে নতুন চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলে নিশ্চিতভাবে আশুরা পেয়ে যাওয়া যায়।
ইবনে আবি শাইবা তাঁর ‘আল-মুসান্নাফ’ (২/৩১৩) গ্রন্থে তাওস رحمه الله থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন:
“আশুরার একদিন আগে ও একদিন পরে রোজা রাখো, যাতে নিশ্চিতভাবে তা পেয়ে যাও।”
ইমাম আহমাদ رحمه الله বলেন: “যে আশুরার রোজা রাখতে চায়, সে যেন ৯ম ও ১০ম তারিখে রোজা রাখে। তবে মাস নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলে তিন দিন রোজা রাখা উচিত।” [আল-মুগনী, ৪/৪৪১]
রোজা হলো এমন একটি ইবাদত যা আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়। এই ইবাদতের জন্য আল্লাহ নির্দিষ্ট কোনো প্রতিদানও ঘোষণা করেননি বরং বলেন, “রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব।” এই প্রতিদান কেমন হবে, আমরা কল্পনাও করতে পারব না।
শাইখ বিলাল ইসমাইল حفظه الله স্মরণ করিয়ে দেন, “রোজা রাখলেই সব মাফ হবে এমন নিশ্চয়তা নেই, এটি আল্লাহর কবুলিয়তের ওপর নির্ভর করে। কাজেই আমাদের উচিত শুধু রোজা রাখাই নয়, বরং সেই রোজা কবুল হওয়ার জন্যও আল্লাহর কাছে দুআ করা।”
শাইখ বিলাল ইসমাইল আরও বলেন, “আমাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, আদর্শ ও বিশ্বাস আছে। আলাদা হওয়াতে কোনো দোষ নেই বরং এটি গর্বের বিষয়। অল্প একটু আমলেই মহান পুরস্কার। আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিচ্ছেন পরিবর্তন হওয়ার জন্য। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে।”
২. সদকা করা (দান করা)
সদকা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। আমরা জানি, আমাদের প্রতিটি কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে গুণিত হয়ে আমাদের আমলনামায় লেখা হয়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম رحمه الله বলেন: “যদি সদকা প্রদানকারী জানত, তার সদকা গরীবের হাতে পড়ার পূর্বে আল্লাহর হাতে পড়ে, তবে অবশ্যই দান করার আনন্দ গ্রহণ করার আনন্দের চেয়েও বেশি হতো।” [মাদারিজুস সালিকীন]
এমন অফার কেন হাতছাড়া করব? এটা এমন এক বিনিয়োগ যা প্রচুর সাওয়াব এনে দেবে। তাই দান করতে পিছপা হবেন না। খোলাখুলি দান করুন। হানাফি ও হাম্বালিদের মতে, মুহাররাম মাসে পরিবার-পরিজনের ওপর উদারভাবে ব্যয় করা উত্তম।
আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: “যে ব্যক্তি মুহাররামের ১০ তারিখে রোজা রাখে, সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল; আর যে ঐদিন সদকা করে, সে যেন পুরো বছরের সদকা করল।” [লাতায়িফুল মা‘আরিফ]
রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি মুহাররামের ১০ তারিখে পরিবার-পরিজনের ওপর উদারভাবে ব্যয় করবে, আল্লাহ তার ওপর পুরো বছর উদার হবেন।” [আল-আওসাত, শু‘আবুল ঈমান]
ইবনে মানসুর (রহিমহুল্লাহ) ইমাম আহমদ (রহিমহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলেন:
“আপনি কি এমন কোনো হাদিস জানেন যেখানে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবার-পরিজনের ওপর উদারভাবে ব্যয় করে, আল্লাহ তাকে সারা বছর উদারতা দান করবেন’?”
তিনি উত্তর দিলেন:
“হ্যাঁ। এটি সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ رَحِمَهُ اللَّهُ জাফর আল আহমার হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-মুনতাশির হতে— যিনি তার সময়ের সর্বোত্তম ব্যক্তিদের একজন ছিলেন—
এটি তাঁর কাছে পৌঁছেছিল যে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবার-পরিজনের ওপর উদারভাবে ব্যয় করে, আল্লাহ তাকে সারা বছর উদারতা দান করবেন।’”
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন: “আমি পঞ্চাশ বা ষাট বছর ধরে এর উপর আমল করছি এবং এতে কেবল কল্যাণই পেয়েছি।”
জাবির رضي الله عنه বলেন: “আমরা এই আমল করেছি এবং সত্যিই এর বরকত পেয়েছি।” আবু যুবায়ের ও শু‘বা رضي الله عنهم-ও একই কথা বলেন।
তবে মনে রাখতে হবে: এই হাদিসগুলোর সনদের ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে এবং বহু আলেম এগুলোকে দুর্বল (ضعيف) বলেছেন—যেমন ইমাম আহমাদ, ইমাম দারাকুতনি, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম তাবারানি, শাইখ আল-আলবানি প্রমুখ।
ইবনু তাইমিয়্যাহ رحمه الله বলেন: “আশুরার দিনে শুধু রোজা রাখাই শরিয়তের বিধান। কাজল লাগানো, গোসল করা, চুল রং করা, বিশেষ সালাত পড়া বা পরিবারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় করা—এসব জাল ও বাতিল হাদিস থেকে এসেছে।” [ইকতিদা আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম ২/১৩২, আল-রাদ ‘আলা শাধিলী]
অন্যদিকে, ইমাম সুয়ুতি, ইমাম আল-কুরদি, ইমাম বায়হাকি, ইমাম হাসকাফি, ইমাম ইবনে আবিদিন প্রমুখ এই হাদিসগুলোকে শক্তিশালী বলেও মত দিয়েছেন।
শেষ কথা হচ্ছে, এ জাতীয় হাদীসের ওপর নির্ভর না করাই উত্তম। তবে সদকা করা ও পরিবারের ওপর ব্যয় করা সাধারণভাবে সব মাযহাবেই প্রশংসিত ও উৎসাহিত আমল।
৩. জিকির করা
আমরা জানি জিকির করলে বিপুল সওয়াব মেলে। এই মাসে জিকির করলে সেই সওয়াব বহুগুণে বেড়ে যায়। মনে রাখুন, প্রতিটি কাজ বহুগুণ করা হয়। জিকির হলো সবচেয়ে সহজ আমল—যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় করা যায়।
হাদিসে উল্লেখিত কিছু মূল্যবান জিকির:
- سُبْحَانَ اللّٰهِ – ১০০ বার = ১০০০ সওয়াব / ১০০০ গুনাহ মাফ [মুসলিম]
- سُبْحَانَ اللّٰهِ وَبِحَمْدِهِ – জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ হয় [তিরমিজি]
- سُبْحَانَ اللّٰهِ وَبِحَمْدِهِ – ১০০ বার = সমুদ্রের ফেনার মতো গুনাহ থাকলেও মাফ [বুখারী]
- لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
= ১০টি দাস মুক্ত করার সওয়াব + ১০০ নেকি + ১০০ গুনাহ মাফ + শয়তান থেকে সুরক্ষা [বুখারী]
৪. অসুস্থ ও এতিমদের খোঁজ নেওয়া
এটি এক দারুণ ইমান-বৃদ্ধিকারী আমল। এতে আপনি উপলব্ধি করবেন আল্লাহ আপনার ওপর কত বেশি অনুগ্রহ করেছেন। সুস্থ পরিবার পাওয়া এক অমূল্য নিয়ামত, যা আমরা অনেক সময় অবহেলা করি।
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
অনেকের জন্য এটা কঠিন হলেও এর সওয়াব অনেক। এমন আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সওয়াব মেলে যার সঙ্গে আপনি কথা বলতেই চান না। এই সময়টা ব্যবহার করুন—মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং তাঁদের দোয়া নিন। মা-বাবার দোয়া হলো এমন এক নিয়ামত যা সবার কপালে থাকে না। যদি মা-বাবা খুশি থাকেন, আল্লাহও খুশি থাকেন।
৬. হাসিমুখে থাকা
আপনি যখন বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে দেখা করবেন, তখন মুখে হাসি রাখুন। একটি ছোট্ট হাসি একজনের মন ভালো করে দিতে পারে। তাদের মধ্যে সাহস ও ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে পারে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অবস্থা যেমন—একটু বেশি হাসি সত্যিই দরকার।
৭. কুরআন তিলাওয়াত করা
পুরোপুরি সাওয়াবের হিসেবে কুরআন তিলাওয়াত হলো সেরা আমল। রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি অক্ষর পড়ে, সে দশটি নেকি পায়। আমি বলি না ‘আলিফ-লাম-মিম’ একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি, লাম একটি, মীম একটি অক্ষর।” [তিরমিজি]
একটি অক্ষর = ১০ সওয়াব! শুধু কল্পনা করুন—একটি পৃষ্ঠা পড়লেই কত সওয়াব!
৮. সুন্নত আমল পালন করা
যত বেশি সম্ভব সুন্নত আমল পালন করার চেষ্টা করুন। এটা আল্লাহর খুব পছন্দনীয়, কারণ এতে আমরা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ -এর আদর্শ অনুসরণ করি। একটি জরুরি সুন্নাহ: আমাদের শিশু ও কিশোরদের নবি ﷺ -এর সীরাহ শিক্ষা দেওয়া। অনেক সময় আমাদের ইতিহাসের অংশ, যেমন—জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধ, কারবালার ঘটনা, হুসাইন رضي الله عنه -এর শাহাদাত, আহলুল বায়তের ঘটনা—এসব এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বিকৃত ইতিহাস জানে ভুল গোষ্ঠীর কাছ থেকে। সুতরাং তাদেরকে সঠিক ইতিহাস শেখানো ফরজের মতো জরুরি।
আশুরার দিন
যদিও মুহাররাম মাস পুরোটাই সম্মানিত, তবে এর মধ্যেও সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানিত দিন হলো ১০ মুহাররাম, যা ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। ইমাম আল-কুরতুবী رحمه الله বলেন, ‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশিরাহ’ (দশম) থেকে এসেছে এবং এটি ফা‘উলা (فاعولاء) ধাঁচে গঠিত, যা গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আশুরার রোজার বিভিন্ন স্তর
প্রথম স্তর
মাক্কার কুরাইশরা আশুরার দিনকে সম্মানিত মনে করত। নূহ عليه السلام অথবা ইবরাহিম عليه السلام-এর কোনো শিক্ষা তাদের মাঝে প্রচলিত ছিল বলেই হয়তো তারা এই দিনটিকে পবিত্র জ্ঞান করত। তারা কা‘বাঘরের গিলাফ পরিবর্তন করত এই দিনে। নবি ﷺ নিজেও এই দিনে রোজা রাখতেন, নাবুয়তের আগেও এবং পরেও।
আয়িশা رضي الله عنها বলেন: “জাহিলিয়াত যুগে কুরাইশরা আশুরার দিন রোজা রাখত এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও এই দিনে রোজা রাখতেন।” [আবু দাউদ]
দ্বিতীয় স্তর
নবি ﷺ যখন মাদীনায় হিজরত করলেন, তখন দেখলেন, ইহুদিরাও আশুরার দিনে রোজা রাখছে।
ইবনে আব্বাস رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ মাদীনায় এসে দেখতে পেলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কিসের রোজা?” তারা বলল, “এটা একটি উত্তম দিন, যেদিন আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাই মূসা عليه السلام এই দিনে রোজা রেখেছিলেন।” তখন নবি ﷺ বললেন, “তোমাদের চেয়ে আমরা মূসার বেশি হকদার।” অতঃপর তিনি নিজেও এই দিনে রোজা রাখলেন এবং মুসলিমদের রোজা রাখতে আদেশ দিলেন। [বুখারি]
রোজাটি তখন ফরজ ছিল, এবং সাহাবারা তাদের সন্তানদেরও রোজা রাখাতে অভ্যস্ত করাতেন। নবি ﷺ লোক পাঠিয়ে ঘোষণা করাতেন।
সালামা ইবনে আকওয়া’ رضي الله عنه বলেন: “আশুরার দিনে নবি ﷺ ঘোষণা করতে বললেন: ‘যে খেয়ে ফেলেছে, সে যেন আর কিছু না খায় এবং রোজা পূর্ণ করে; আর যে এখনো খায়নি, সে যেন রোজা রাখে।” [বুখারি]
তৃতীয় স্তর
২ হিজরিতে রমাদান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর, আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। আয়িশা رضي الله عنها বলেন: “যখন রমাদান মাসের রোজা ফরজ করা হলো, তখন রাসূল ﷺ বললেন: ‘যে ইচ্ছা করে, সে আশুরার রোজা রাখুক; আর যে ইচ্ছা না করে, সে না-ও রাখতে পারে।” [মুসলিম]
এই সময় ৯ মুহাররাম (তাসু‘আ) নামক দিনটিও প্রসিদ্ধি লাভ করে।
আলকামা বলেন: আশআস ইবনে কায়স, ইবনে মাসউদ رضي الله عنه -এর কাছে গেলেন, তখন তিনি আশুরার দিনে খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “আবু আব্দুর রহমান! আজ আশুরার দিন, অথচ আপনি খাচ্ছেন?” তখন তিনি বলেন, “রমাদানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই দিনে রোজা রাখা হতো। এরপর এটি ত্যাগ করা হয়। তাই যদি রোজা না রাখো, খেতে পারো।” [মুসলিম]
চতুর্থ স্তর
ফতহে মক্কা ও “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিলাম…” [সূরা মায়েদা: ৩] আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নবি ﷺ-কে নির্দেশ দেওয়া হয় অবিশ্বাসীদের অনুরূপ না হতে। ইসলাম একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা।
ইবনে উমর رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: “যে কোনো জাতির মতো আচরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” [আবু দাউদ]
এ কারণেই রাসূল ﷺ ইহুদিদের মতো কেবল ১০ তারিখে রোজা না রেখে, এর সাথে ৯ তারিখকেও যুক্ত করতে চাইলেন। ইবনে আব্বাস رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: রাসূল ﷺ বলেন, “যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” [মুসলিম]
বিতর্ক: এটা কি শোকের দিন?
শিয়ারা মুহাররাম মাসের বরকতময়তা ও আশুরার মর্যাদাকে ঢেকে দেন শোক ও মাতমের মাধ্যমে। আল্লাহর রহমতের স্মরণ ও শুকরিয়া আদায়ের পরিবর্তে তারা এটিকে হুসাইন رضي الله عنه -এর শাহাদাতের শোকের মাস বানিয়ে ফেলে।
অনেকে মনে করে মুহাররাম মাসে বিয়ে, আনন্দ ইত্যাদি করা নিষিদ্ধ—এটি ভিত্তিহীন ও বিদআত। এখানে একটি মূলনীতি বুঝা জরুরি: যদি শরিয়ত কোনো দিনকে শোকের দিন বা শয়তানী দিন নির্ধারণ না করে, তাহলে দুনিয়ার কোনো ঘটনাই সেটিকে শোকের দিন বানাতে পারে না। তেমনি, যদি শরিয়ত কোনো দিনকে ঈদ বা আনন্দের দিন নির্ধারণ না করে, তবে কোনো ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু সেই দিনকে উৎসবের দিন বানাতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাস শহীদের রক্তে পরিপূর্ণ। যদি শহীদের মৃত্যুতে শোক পালন করা হতো, তবে প্রতিদিনই শোকের দিন হতো। হুসাইন رضي الله عنه -এর শাহাদাত আশুরা দিনে হওয়া ছিল তাঁর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় নেয়ামত। তাই তাঁর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে বিদআতমূলক রসম-রেওয়াজ পরিহার করতে হবে।
দুটি চরমপন্থা রয়েছে এবং উভয়ই বাতিল:
- একদল মুহাররামকে শোকের মাস বানায় (শিয়া)
- আরেক দল এটিকে উৎসব ও আনন্দের মাস বানায় (নাসিবি ও খারিজি)
আহলে সুন্নাহ – মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে।
যদি শহীদের মৃত্যু শোকের দিন হতো, তবে:
- উমর رضي الله عنه – ১ মুহাররামে খুন হন
- উসমান رضي الله عنه নির্মমভাবে হত্যা হন
- আলী رضي الله عنه -কে হত্যা করা হয়
- হামযা رضي الله عنه -কে ছিন্নভিন্ন করে হত্যা করা হয়
- আরও বহু সাহাবী যাঁদের মর্যাদা হুসাইন رضي الله عنه -এর চেয়েও বেশি—তাঁদের শাহাদাত হয়েছে
তবুও নবি ﷺ বা সাহাবারা তাদের মৃত্যুকে স্মরণ করে শোক বা কোনো দিবস পালন করেননি।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ رحمه الله বলেন:
“হাসান ও হুসাইন رضي الله عنهما জান্নাতি যুবকদের নেতা। তারা হিজরতের পরে ইসলামের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন। তারা পূর্ববর্তী নেককারদের মতো কষ্ট পাননি। তাই আল্লাহ তাদের শাহাদাত দিয়ে তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন। ঠিক যেমন হামযা, আলী, জাফর, উমর, উসমান رضي الله عنهم -দের শাহাদাতের মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।” [রাস্ আল-হুসাইন]
আশুরা ও সাহাবা সম্পর্কে শিয়া মতবাদকে কেন্দ্র করে ভুল ধারণার খণ্ডন
শাইখ তাওফিক চৌধুরী حفظه الله একবার এক শিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নিজেকে মারো আর শোক পালন করো কেন?” লোকটি উত্তর দিল যে, তারা আল-হুসাইন رضي الله عنه -এর মৃত্যুর জন্য শোক পালন করে।
শাইখ তাকে আরেকটু জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন, “তুমি শোক পালন করো কেন, যখন সন্দেহ নেই যে হুসাইন জান্নাতে আছেন। শুধু জান্নাতে নয়, তিনি জান্নাতিদের অন্যতম নেতা—এমনটি নবি ﷺ আমাদের বলেছেন। শিয়া ও সুন্নি উভয়েই এ ব্যাপারে একমত যে হুসাইন জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত।”
আমাদের স্মরণ রাখা উচিত নবি ﷺ -এর শিক্ষা, যিনি শোক পালনের আদব পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা দিয়েছেনঃ
“যে নারী আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য স্বামীর ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়। স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করা বৈধ।” [বুখারি]
সাহাবাদের গালি দেয়া (তাবাররাঃ التبرأ)
এই দিনগুলোতে আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর সাহাবাদের গালি দেয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটানোর ঘটনাগুলো ঘটে। লক্ষ্যবস্তু করা হয় আমাদের মা আয়েশা, আবু বকর আস-সিদ্দীক ও উমার আল-ফারুক رضي الله عنهم -কে। আমাদের মায়ের মর্যাদা কুরআনে সুনিশ্চিতভাবে স্থাপিত হয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে।
ইমাম আহমাদ رحمه الله বলেছেন, “যে ব্যক্তি আবু বকর, উমার অথবা আয়েশাকে গালি দেয়, সে মুসলিম হিসেবে গণ্য নয়।”
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেনঃ
وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশ করেছে এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে—আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত—তারা তাতে চিরকাল থাকবে। এটিই হচ্ছে চরম সাফল্য।” [সূরা তাওবাহ, ১০০]
সাহাবাদের গালি দেয়া মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ -কে অপমান করা। এর মাধ্যমে বুঝায় যে রাসূল ﷺ যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন না উপযুক্ত লোকদের বেছে নিতে, অথবা তিনি তাঁদের যথাযথভাবে শিক্ষা দিতে পারেননি। এবং আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের দ্বারা তাঁর দ্বীনকে সংরক্ষিত রাখতে দিয়েছেন, যারা এই গালি দাতাদের মতে অযোগ্য ছিল। আজিব ব্যাপার!
আবু সাঈদ আল-খুদরী رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ বলেন, “আমার সাহাবাদের গালি দিও না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তাহলেও তা তাদের একজনের একটি মুদ বা অর্ধেক মুদ দানের সমতুল্য হবে না।” [বুখারি]
১ মুদ = ২ হাতের মুঠো পরিমাণ, প্রায় ৫১০–৭৫০ গ্রাম।
এটি সাহাবাদের মহান মর্যাদা ও গৌরবের প্রমাণ। যদি সাধারণ সাহাবাদের সম্পর্কেই এমন কথা বলা হয়, তাহলে:
- বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবা,
- মুআয ইবনে জাবাল رضي الله عنه, যাঁর মৃত্যুর সময় আরশ কেঁপেছিল,
- জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবা,
- নবি ﷺ -এর স্ত্রীগণ— তাঁদের মর্যাদা কত বিশাল হবে?
শাইখ ড. আব্দুল করিম আল-খুদাইর حفظه الله বলেন: “এই হাদীসের পটভূমি হলো—খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদ ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ رضي الله عنهما -এর মাঝে একবার বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং খালিদ, আবদুর রহমানকে গালি দেন। তখন রাসূল ﷺ খালিদকে লক্ষ্য করে বলেন: ‘আমার সাহাবাদের গালি দিও না!’”
তিনি ﷺ এই কথা খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদ-কে বললেন, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ ইসলামকে সাহায্য করেছেন! এটি প্রমাণ করে সাহাবাদের মর্যাদা কত উঁচু! যদি সাহাবারা একে অপরকে গালি দিলে রাসূল ﷺ বিরক্ত হন, তাহলে সাহাবী নন—এমন কেউ যদি সাহাবাদের গালি দেয়, তার কী অবস্থা হবে?!
একটি আরেকটি হাদীসে, ইবনে উমর رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার সাহাবাদের গালি দেয়, তার ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।” [আল-মুজাম আল-আওসাত]
আল-বারা’ رضي الله عنه বলেন: “আমি নবি ﷺ -কে বলতে শুনেছি: ‘আনসারগণ—মুমিন ছাড়া কেউ তাদের ভালোবাসে না। আর মুনাফিক ছাড়া কেউ তাদের ঘৃণা করে না। যে তাদের ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যে তাদের ঘৃণা করে, আল্লাহ তাকে ঘৃণা করেন।” [বুখারি]
তারা এও দাবি করে যেন নবি ﷺ -এর পরিবার এই দুই সাহাবা—আবু বকর ও উমার رضي الله عنهما -কে ঘৃণা করতেন। তোমরা জানতে চাও তাঁদের মর্যাদা? দেখো তাঁরা কোথায় দাফন হয়েছেন এবং তাঁদের প্রতিবেশী কে।
ইমাম আওযা’ঈ رحمه الله বলেন: “যে ব্যক্তি আবু বকরকে গালি দেয়, সে তার দ্বীন থেকে বেরিয়ে গেছে; তার রক্ত হালাল।” [ইবানাহ আস-সুগরা]
তিনি এত কঠিন কথা বললেন কেন? কারণ যে আবু বকরকে গালি দেয়, সে কুরআন অস্বীকার করেছে।
ইমাম আবু যর‘আ আর-রাযী رحمه الله বলেন: “যদি তুমি এমন কাউকে দেখ যে রাসূল ﷺ -এর সাহাবাদের সমালোচনা করছে, তবে জেনে নাও সে একজন বিদআতি।”
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল رحمه الله বলেন: “যদি তুমি এমন কাউকে দেখ যে সাহাবাদের খারাপভাবে উল্লেখ করছে, তবে তার ইসলাম নিয়ে সন্দেহ করো।”
ইমাম যাহাবী رحمه الله লেখেন: “যে ব্যক্তি সাহাবাদের নিয়ে খারাপ আলোচনা করে বা তাঁদের গালি দেয়, সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে। সে মুসলিমদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যদি কেউ সাহাবাদের দোষারোপ করে, তবে তাকে মুনাফিক হিসেবে গণ্য করা হবে।” [আল-কাবায়ির]
আসিম আল-আহওয়াল থেকে বর্ণিত, আবুল ‘আলিয়াহ বলেন:
﴿ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ﴾ – ‘আমাদের সরল পথে পরিচালিত কর’—এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ “এটি হলো নবি ﷺ এবং তাঁর দুই সাথী—আবু বকর ও উমার।” আসিম বলেন, আমি এটি হাসান আল-বাসরী رحمه الله -কে বললে, তিনি বলেন, “আবুল আলিয়াহ সত্য বলেছেন এবং উত্তম পরামর্শ দিয়েছেন।” [ইমাম মারুযী, আস-সুন্নাহ]
আবুল আলিয়াহ رحمه الله একজন বরেণ্য তাবেঈ, যিনি রাসূল ﷺ -এর যুগে জন্মগ্রহণ করেন এবং আবু বকর رضي الله عنه -এর খেলাফতের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁকে সাহাবাদের পর কুরআন সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। [সিয়ার ৪/২০৮]
এক নজরে আলী رضي الله عنه -এর বংশের একটি পারিবারিক চার্টই প্রমাণ করে দেয়, তাঁরা আবু বকর ও উমার رضي الله عنهما -এর প্রতি কতটা ভালবাসা রাখতেন। যদি কাউকে আহলুল বাইত বা আলীর শিয়া বলা হয়, তবে তা শুধুমাত্র আহলুস সুন্নাহর জন্যই প্রযোজ্য।

আলী ও ফাতিমা رضي الله عنهما এর বংশ তালিকা

আলী رضي الله عنه ও তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের বংশ
সাহাবাদের মর্যাদা, তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা এবং হুসাইন رضي الله عنه-এর তাওহীদের পথ
ইবনে আব্বাস رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: যখন উমর رضي الله عنه -এর জানাজা বিছানায় রাখা হয়, তখন মানুষ তার চারপাশে জড়ো হয় এবং তার জন্য দোয়া করতে লাগল, এবং আমি তাদের মধ্যেই ছিলাম। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম কেউ আমার কাঁধে হাত রেখেছে, দেখি তিনি আলী ইবনে আবি তালিব رضي الله عنه।
আলী উমরের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করে বললেন, “হে উমর! আপনি এমন একজনকে রেখে যাচ্ছেন না যার আমল আমি পছন্দ করি এবং যার মতো আমল নিয়ে আমি আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে চাই—আপনার আমলের চাইতে বেশি। আল্লাহর কসম! আমি সবসময়ই মনে করতাম যে, আল্লাহ আপনাকে আপনার দুই সাথীর সাথে রাখবেন। কারণ, আমি প্রায়ই রাসূল ﷺ -কে বলতে শুনতাম, ‘আমি, আবু বকর এবং উমর কোথাও গেলাম; আমি, আবু বকর এবং উমর কোথাও প্রবেশ করলাম; আমি, আবু বকর এবং উমর কোথাও থেকে বের হলাম।’” [বুখারি]
মুহাম্মদ ইবনে আল-হানাফিয়া رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: আমি আমার পিতা (আলী ইবনে আবি তালিব رضي الله عنه)-কে জিজ্ঞেস করলাম, “আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর পর কারা সেরা মানুষ?” তিনি বললেন, “আবু বকর।” আমি বললাম, “তারপর কে?” তিনি বললেন, “তারপর উমর।” আমি আশঙ্কা করলাম তিনি উসমান বলবেন, তাই আমি বললাম, “তারপর আপনি?” তিনি বললেন, “আমি তো কেবল একজন সাধারণ মানুষ।” [বুখারি]
মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-বাকির رضي الله عنه বলেন: “যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমর رضي الله عنهما -এর ফজিলত জানে না, সে নিশ্চয়ই সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ।” [আবু নু‘আইম, আল-হিলইয়াহ]
আল-হাসান ইবনে যায়েদ ইবনে হাসান থেকে বর্ণিত: আমার পিতা আমাকে বললেন, তিনি তার পিতা থেকে শুনেছেন, যে আলী বলেছিলেনঃ আমি নবি ﷺ -এর সঙ্গে ছিলাম, তখন আবু বকর ও উমর رضي الله عنهما এলেন, এবং তিনি বললেন, “হে আলী, নবি ও রাসূলদের পর, এ দু’জন জান্নাতবাসীদের মধ্যবয়সী ও যুবকদের নেতা।” [আহমাদ]
আমাদের শাইখ, ড. ইব্রাহীম নূহু حفظه الله বলেন: “যারা সাহাবাদের নিয়ে কথা বলে ও ঝগড়া করে, তাদের অধিকাংশই তাদের দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞ। তাদের দ্বীন দুর্বল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাদেরকে তাদের বিভ্রান্ত উৎস থেকে আলাদা করার চেষ্টা করো। অনেক সময় যখন আমরা তাদের নিজেদের বই থেকেই কিছু বলি, তখন তারা স্তব্ধ হয়ে যায়।
এমন লোকদের সাথে অন্য কোনো নাম না এনে, সবকিছু সুন্নাহ এবং রাসূল ﷺ -এর দিকে সংযুক্ত করে শিক্ষা দাও—ইনশাআল্লাহ ভালো ফলাফল দেখতে পাবে।”
সাহাবারা একটি একক সত্তা। আপনি তাদের বিভক্ত করতে পারেন না—একদলকে ভালোবাসবেন, আরেক দলকে ঘৃণা করবেন। তাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখিয়ে এদের বুঝাও। উমর رضي الله عنه আলীর ঘরে বিবাহ করেছিলেন। আলী তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন আবু বকর ও উমরের নামে। যদি তাদের মাঝে বিদ্বেষ থাকত, তাহলে তারা কি এমন করতেন? যে ব্যক্তি সাহাবাদের গালি দেয়, মূলত সে আল্লাহর উপরই অভিযোগ করছে—যেন তিনি তাঁর রাসূল ﷺ -এর জন্য ভালো সাথী বেছে নেননি। এটি রাসূল ﷺ -এর জন্য অপমান—যেন তিনি ভালো সঙ্গী নির্বাচন করতে পারেননি। এমনকি আমাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেও, যদি আপনি কাউকে জানতে চান, আপনি তার বন্ধুবান্ধবের দিকে তাকান।
আসলে, এসব খারাপ লোকেরা সুন্নাহ আক্রমণ করার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছে। সাহাবারা যদি হটে যায়, তাহলে সুন্নাহও হটে যাবে। কারণ, সুন্নাহ তো সাহাবাদের মাধ্যমেই আমাদের কাছে পৌঁছেছে। এটাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ—যিনি সর্বজ্ঞ—কুরআনে ঘোষণা করেছেন, তিনি সাহাবাদের প্রতি সন্তুষ্ট।
হুসাইন رضي الله عنه -কে উপাস্য বানানো
মানুষ হুসাইন رضي الله عنه -কে দুআয় ডাকে এবং তাকে এক প্রকার উপাস্যরূপে স্থাপন করে। কিন্তু হুসাইন رضي الله عنه এ সকল থেকে মুক্ত।
তিনি যখন মদিনা ছেড়েছিলেন, তখন তিনি কেবল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেছিলেন। মক্কায় থাকাকালীন, তিনি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেছিলেন। কুফায় পৌঁছালে তিনি জালিমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য চেয়েছিলেন। কারবালায় যখন তিনি শত্রুদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি শুধু আল্লাহর নিকট সাহায্য চাচ্ছিলেন, ধৈর্য কামনা করছিলেন।
যখন তাঁর সন্তানদের শহীদ করা হয়, তখন তিনি আল্লাহর জন্য প্রশংসা করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের সময়, তিনি আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন তার বরকতময় তরবারির সঙ্গে। তিনি এই উম্মাহর জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন যে, একজন তাওহীদবাদী মুসলিম যেকোনো পরিস্থিতিতেই কেবল আল্লাহর সামনেই সেজদা করবে। তিনি কখনো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আহ্বান করেননি। এমন কোনো বর্ণনা নেই যে, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নবি ﷺ, তার পিতা আলী, তার মাতা ফাতিমা, বা ভাই হাসান رضي الله عنهم -কে ডেকেছেন। শান্তি বর্ষিত হোক কারবালার শহীদ, নবি ﷺ -এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতি যুবকদের নেতা, তাওহীদের প্রচারকের প্রতি।
তাজিয়া, মাতম, ও মহররমে উদ্ভট রীতির ইতিহাস ও ইসলামী অবস্থান
তাজিয়া (তাজিয়াদারি), শোক মিছিল ও আত্মপীড়নের প্রথা
তাজিয়া মূলত শোক প্রকাশ বা সমবেদনার অর্থে ব্যবহৃত হতো। পারস্যে এটি হুসাইন رضي الله عنه -এর শাহাদাতের নাট্যরূপ উপস্থাপন করত। ভারতে এটি এমন শোক মিছিলে রূপান্তরিত হয়, যেখানে কবর সদৃশ কাঠামো (কারবালার প্রতীক) রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হতো এবং ১০ই মুহাররামে সেগুলো কবরস্থ করা হতো। এই প্রথা ছিল ভারতের পক্ষ থেকে শিয়াদের প্রতি একটি ‘উপহার’।
আরও একটি প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস অনুযায়ী, এই প্রথা শুরু হয়েছিল মঙ্গোল শাসক তামুর লং (তাইমুর)—যাকে Timur the Lame বা Tamerlane বলা হয়—তার মাধ্যমে। তিনি প্রতিবছর মুহাররমে বাগদাদের হুসাইন رضي الله عنه -এর কবর জিয়ারত করতেন। কিন্তু ১৩৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দ (৮০০-৮০১ হিজরি) সালে ভারতের দিল্লিতে মুহাম্মদ শাহ তুঘলকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কারণে তিনি যেতে পারেননি। তখন তিনি আদেশ দেন যেন কারবালার মাজারের একটি অনুরূপ নির্মাণ করা হয়। এতে কারবালার কিছু মাটি আনা হয় এবং সময় স্বল্পতার কারণে বাঁশ ও কাগজ দিয়ে একে বানানো হয় ৮০১ হিজরিতে। এরপর আওধ ও দিল্লির সুলতানরা এটিকে অনুকরণ করতে থাকে। তারপর এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে মুসলমান ও অমুসলিমদের মাঝে—রাজাদের খুশি করতে করতে। তখন থেকেই এই প্রথা ‘তাজিয়াদারি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই প্রথা মুঘল আমলেও চালু ছিল। শাইখ মকসুদুল হাসান ফাইজী حفظه الله বলেন—মুঘলদের মধ্যে কেবল এক শিয়া বাদশাহ ছিলেন, তিনি হলেন নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ (হুমায়ূন)। তিনি পারস্যের সাহায্য চেয়ে তার সিংহাসন ফিরে পান এবং পরে পারস্যীয় শিয়া পরিবারের সাথে বিবাহসূত্রেও যুক্ত হন। যেহেতু ইরানে লোকেরা হুসাইন رضي الله عنه -এর কবর জিয়ারত করত, কিন্তু প্রতিবছর সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই তারা তার বদলে তাজিয়া বানিয়ে শোক পালন শুরু করে।
বছরের পর বছর ধরে এতে আরও অনেক কিছু যোগ হয়। অনেক হিন্দু আচারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলমানরা তাদের মতো করে উৎসব উদযাপন শুরু করে। হিন্দুদের দশেরা উৎসব যেমন দশ দিন ধরে চলে, তেমনি তারা মুহাররমের দশদিন ধরে মিছিল করা শুরু করে। হিন্দু রামলীলা নাট্যে যুদ্ধের দৃশ্য দেখানো হয়, তেমনি তারা কারবালার যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরে।
আরব দেশের শিয়ারাও বলেছেন—এটি তাদের কাছে ছিল একেবারেই অজানা। এই প্রথার সূচনা হয় ভারতেই। এইসব মিছিলে বহু লোকজন অংশগ্রহণ করায় এটিকে পরে অন্যান্য শিয়া সম্প্রদায়ও অনুসরণ করতে শুরু করে।
এই সকল মিছিলে অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং একটি গুরুতর গুনাহ। কারণ, এই তাজিয়াগুলোকে শ্রদ্ধা করা হয়, তাদের কাছে প্রার্থনা করা হয়। এটি শিরক ও অবিশ্বাসীদের অনুকরণের চূড়ান্ত রূপ।
আত্মপীড়ন (Self-flagellation) – ইসলামে নিষিদ্ধ
মুহাররমের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি কুখ্যাত প্রথা হলো আত্মপীড়ন বা Self-flagellation। শাইখ ইবনে হুসাইন এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, যার কয়েকটি মূল বিষয়:
এটি এমন একটি ভক্তিমূলক আচরণ যেখানে ব্যক্তি নিজেকে চাবুক বা অন্যান্য যন্ত্র দিয়ে আঘাত করে অনুশোচনার প্রকাশ করে। ইসলামে এটি সম্পূর্ণ হারাম। এই প্রথা প্রথম দেখা যায় গ্রিক-রোমান ও প্রাচীন মিশরীয় উপাসনালয় ও কাল্টে। স্পার্টার আরথেমিস, মিশরের আইসিস কাল্ট, ও গ্রিসের ডায়োনিসাস কাল্ট এসব চর্চা করত। রোমানদের ‘লুপারক্যালিয়া’ উৎসবে নারীদের চাবুক মারা হতো সন্তান উৎপাদনের আশায়। খ্রিষ্টানদের মধ্যেও ‘Mortification of the Flesh’ নামে এটি প্রচলিত ছিল—তারা ভাবত, এটা ঈসা عليه السلام-এর কষ্টকে অনুকরণ করা। শিয়ারা হুসাইন رضي الله عنه -এর রক্তপাত অনুকরণে আত্মপীড়ন করে থাকে। হিন্দুদের মধ্যেও আছে ‘গরুড়ন ঠুক্কাম’ ও ‘থাইপুসাম’-এর মতো আত্মনির্যাতন উৎসব।
যদিও সব শিয়া চরম পর্যায়ের ‘তাতবির’ বা ‘যানজির যানি’ করে না, তথাপি কওম (ইরান) এর বহু বড় ‘আয়াতুল্লাহ’ তা অনুমোদন করে এবং এমনকি শিশুদের উপরও তা করে! রক্তপাত হোক বা না হোক, আত্মদণ্ডের এসব আচার ইসলামে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এগুলোর উৎপত্তি খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে, সাফাভিদের মাধ্যমে ইরানে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে ইরাক ও উপমহাদেশে প্রবেশ করে।
রাসূল ﷺ বলেছেন: “সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে নিজের গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহিলিয়ার মতো চিৎকার করে।” [বুখারি]
উপমহাদেশে এই প্রথা ‘নোহা’ বা ‘মাতম’ নামে পরিচিত।
এমনকি হুসাইন رضي الله عنه স্বয়ং, শাহাদাতের আগে তাঁর বোন জয়নাব رضي الله عنها -কে বলেছিলেন:
“হে আমার প্রিয় বোন! আমি তোমার উপর কসম করে বলছি, যদি আমি মৃত্যুবরণ করি তবে তুমি আমার জন্য কাপড় ছিঁড়বে না, মুখে আঁচড় কেটে কান্না করবে না, কাউকে অভিশাপ দেবে না বা মৃত্যুর প্রার্থনা করবে না।”
[ইবনুল আসীর, আল-কামিল]
নববর্ষের উদযাপন?
যেহেতু এটি হিজরি ক্যালেন্ডারের শুরু, অনেকে উত্তেজনায় পড়ে যান এবং গ্রেগরিয়ান নববর্ষের মতো করে উদযাপন শুরু করেন। আমাদের শান্ত হতে হবে, সত্যিই। সোশ্যাল মিডিয়া স্প্যাম না করে বরং এই সময়টা সদকায়, দুআয়, বা সমাজে উপকারী কিছু কাজে ব্যয় করা উচিত। এটা আত্মসমালোচনার সময়। আল্লাহ বলেন:
يَٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌۭ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍۢ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ করেছে। এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।” [সূরা হাশর, আয়াত ১৮]
আমাদের ইমাম, আহমাদ ইবনে হাম্বল رحمه الله বলেন: “আমি নববর্ষের অভিনন্দন (مُعَايَدَة) শুরু করি না, তবে কেউ আমাকে বললে আমি জবাব দিই। কারণ জবাব দেওয়া ওয়াজিব, কিন্তু প্রথমে বলা সুন্নাহ নয়, নিষিদ্ধও নয়।”
হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে পড়ার মতো কোনো নির্দিষ্ট দুআ নেই। মুহাররম মাসকে বছর হিসেবে নির্ধারণ করা হয় উমর ইবনুল খাত্তাব رضي الله عنه -এর খিলাফতে। এটি রাসূল ﷺ -এর সময়ে ছিল না এবং তাই শরিয়তের অংশ নয়।
শাইখ ইবনে উসাইমীন رحمه الله বলেন: “কেউ যদি আপনাকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়, আপনি উত্তর দিন—‘আল্লাহ তোমার জন্য এ বছরকে কল্যাণময় করুক।’ কিন্তু আপনি আগে থেকে এ অভিনন্দন শুরু করবেন না। সাহাবা ও সালাফদের থেকে এমন কিছু জানা যায় না।” [আল লিকাই’ শাহরি, ৪৪]
সাধারণ কল্যাণের দুআ করা যেতে পারে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দুআ বা নির্দিষ্ট সংখ্যক দুআ প্রমাণিত নয়। এমন কোনো নির্দিষ্ট আমল শুরু করলে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে।
শুধু একটি হাদীসে এসেছে যা আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিক: তলহা ইবনে উবায়দুল্লাহ رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: নবি ﷺ নতুন চাঁদ দেখলে বলতেন:
اللهم أهله علينا بالأمن والإيمان والسلامة والإسلام، ربي وربك الله، هلال رشد وخير
“হে আল্লাহ! এই চাঁদ আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে উদিত করুন। (হে চাঁদ!) তোমার রব এবং আমার রব হচ্ছে আল্লাহ। হে চাঁদ! তুমি হিদায়াত ও কল্যাণের বার্তা।” [তিরমিজি]
হিজরি নববর্ষ, আশুরা ও বিদআতের ব্যাপারে ভুল ধারণা: একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা
সহিহ দুআ ও সাহাবাদের আমল
আল-হাফিয ইবনে হজর رحمه الله আল ইসাবা ফি আসমা আস-সাহাবা গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম رضي الله عنه -এর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সাহাবিগণ দুআ শেখার ক্ষেত্রে তিলাওয়াতের মতোই গুরুত্ব দিতেন। যখন কোনো নতুন মাস বা বছর আসত, তখন তারা এই দুআটি করতেনঃ
اللّٰهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ، وَالْإِيمَانِ، وَالسَّلَامَةِ، وَالْإِسْلَامِ، وَجِوارٍ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرِضْوَانٍ مِنَ الرَّحْمٰنِ
“হে আল্লাহ! তুমি আমাদের এ সময়ের উপর নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে প্রবেশ করাও এবং শয়তানের থেকে হেফাজত করো ও আর-রাহমানের সন্তুষ্টি দান করো।”
শাইখ মুহাম্মাদ দানিয়েল বলেন—ইমাম বুখারী رحمه الله এই দুআ বর্ণনাকারী একই সনদ ব্যবহার করেছেন তাঁর সহিহ গ্রন্থেও।
মুহাররাম মাস ও কুসংস্কার
আমাদের বহু ভাই এমন ভুল ধারণায় পড়েছেন যে মুহাররম মাসে ‘অমঙ্গল’ আছে, বিবাহ না করা উচিত, ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত ইত্যাদি। এসব ভিত্তিহীন এবং কুসংস্কার।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ رحمه الله -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ
“আশুরার দিনে মানুষ যে কাজগুলো করে—যেমন: চোখে সুরমা লাগানো, গুসল করা, মেহেদি লাগানো, বিশেষ খিচুড়ি রান্না, শুভেচ্ছা বিনিময় ও রাস্তায় খুশি প্রকাশ, এগুলোর কোনো কিছু কি নবি ﷺ থেকে সহিহ হাদীসে বর্ণিত আছে? অথবা অন্য দলের করা মাতম, আর্তনাদ, পানি না খাওয়া, অস্বাভাবিক সুরে কোরআন তিলাওয়াত, জামা ছেঁড়া—এগুলো কি প্রমাণিত?”
তিনি জবাব দেন:
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। এইসব কাজ সম্পর্কে নবি ﷺ থেকে বা তাঁর সাহাবাদের থেকে কিছুই প্রমাণিত নয়—না সহিহ, না দুর্বল সনদে। চার ইমাম বা অন্যান্য সালাফদের কেউ এসবকে মুস্তাহাব করেননি। হাদিস গ্রন্থকারদের কেউ এইসব বর্ণনা করেননি। এমনকি সাহাবা, তাবেয়ীন বা তাদের অনুসারীদের থেকেও কিছুই পাওয়া যায় না।
হাঁ, পরে যুগে কেউ কেউ এমন দুর্বল হাদিস বানিয়েছে যেমনঃ ‘যে আশুরার দিনে চোখে সুরমা লাগাবে, সে বছর সে চোখের ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে না’; ‘যে গুসল করবে, সে অসুস্থ হবে না’ ইত্যাদি।” [মাজমু আল ফাতওয়া]
“দুঃখ করো না” – একটি মহিমান্বিত বাক্য
হিজরী বর্ষপঞ্জি ভিত্তি করে রসূল ﷺ এর হিজরতের উপর। এই উপলক্ষে অনেকেই তাঁর সেই অমর বাক্য মনে করেন যা তিনি আবু বকর رضي الله عنه -কে বলেছিলেন:
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
“দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”
এই বাক্য শুধু অনুপ্রেরণার জন্য নয়; বরং এটি একটি ঐশী প্রতিশ্রুতি—যারা আল্লাহর পথে চেষ্টা করে, তাদের জন্য।
এই বাক্য যখন বলা হয়েছিল তখন কী পরিস্থিতি ছিল?
১) মুসলিমদের উপর প্রচণ্ড নির্যাতন চলছিল।
২) কুরাইশের ১১ জন ব্যক্তি নবি ﷺ -কে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
৩) মক্কা থেকে বের হওয়ার সব রাস্তায় সশস্ত্র প্রহরী ছিল।
৪) নবি ﷺ ও আবু বকর رضي الله عنه -এর মাথার উপর ১০০ উটের পুরস্কার ঘোষণা ছিল।
৫) রসদ কমে গিয়েছিল।
৬) গারে সাওর-এ থাকা অবস্থায় আবু বকর رضي الله عنه বিছার কামড়ে আহত হন।
৭) পুরস্কারপ্রাপ্ত এক অনুসন্ধানকারী গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
তবুও তিনি ﷺ বলেন: “দুঃখ করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”
এরপরের আয়াতে আল্লাহ বলেন:
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ...
“তোমরা যদি নবিকে সাহায্য না করো, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছেন…” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৪০]
মুসা عليه السلام ও আশুরার বিজয়
এই মাসেই আল্লাহ মুসা عليه السلام ও তাঁর অনুসারীদের বিজয় দিয়েছিলেন—তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ফেরাউন, এক ভয়ংকর জালেম।
আমরাও দুআ করি: আল্লাহ যেন আমাদের অবস্থাও উত্তম করেন, আমাদের দুর্বলতা ক্ষমা করেন, আমাদেরকে সৎ কাজে সাহায্য করেন, এবং তাঁর ভালবাসায় আমাদের উত্তম প্রতিদান দেন।
কারণ, আল্লাহ সেই ব্যক্তিদেরই ভালোবাসেন, যাদেরকে তিনি ইবাদতের তাওফিক দেন। আর তিনি শুধুমাত্র তাঁদেরই হেদায়াত দেন, যারা তাঁর কাছে তাওবা করে ফিরে আসে।
আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে এই আমল কবুল করুন, আমাদের নেক আমল গুণে বাড়িয়ে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলোকে ক্ষমা করে দিয়ে আরও ভালোতে রূপান্তর করুন। হে ভাই, হে বোন, শক্ত থাকুন— “দুঃখ করবেন না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”








No Comment! Be the first one.