শুধু যুক্তরাজ্যেই ৩১ মিলিয়ন মানুষ উইল (ইচ্ছাপত্র) ছাড়াই জীবনযাপন করছে। ৩৫ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের মধ্যে ৮৪% উইল তৈরি করেনি; এবং সামগ্রিকভাবে এই মানুষদের মধ্যে ৬০%–এর উইল হালনাগাদ নেই। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইসলামে মৃত্যু একটি শক্তিশালী রিমাইন্ডার হিসেবে কাজ করে, যা মুমিনদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন সীমিত এবং অনিশ্চিত। মৃত্যু এমন একটি অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা, যা বয়স, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা—কোনো কিছুকেই মানে না; হঠাৎ করে এসে আমাদের প্রিয়জনদের কিংবা আমাদেরকেও ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আদম সন্তানের সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
هُوَ يُحْىِۦ وَيُمِيتُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান, এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। [সূরা ইউনুস: ৫৬]
আরও বলেন:
كُلُّ نَفْسٍۢ ذَآئِقَةُ ٱلْمَوْتِ ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে, তারপর তোমরা আমাদেরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা আনকাবুত: ৫৭]
একজন মুসলিম হিসেবে এই বাস্তবতা আমাদেরকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের উপর চিন্তাশীল করে তোলে এবং আখিরাতের প্রস্তুতির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলাম আমাদেরকে মৃত্যু পর্যন্ত সচেতনভাবে জীবন যাপন করতে, তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের সাথে জীবন কাটাতে উৎসাহিত করে। মৃত্যু কখন আসবে তা অনিশ্চিত—এই বাস্তবতাকে হৃদয়ে ধারণ করে, আমাদের উচিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা করা, এমনকি মৃত্যুর পরও যেন আমাদের রেখে যাওয়া সম্পদ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সঠিকভাবে বণ্টিত হয়।
আমরা আল্লাহর এমন এক সৃষ্ট জীব, যাদের দুনিয়ায় জীবনযাপনের সু্যোগ দেয়া হয়েছে নবি করিম ﷺ–এর বার্তার একটি অংশ বহন করার দায়িত্ব দিয়ে। সুতরাং আমরা আমাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার কিভাবে পরিচালনা করছি, সেটিই দুনিয়ায় আমাদের রেখে যাওয়া শেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এজন্যই এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আমাদের উইল ও সম্পত্তির বণ্টন যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
দুই পর্বে আমরা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করবো একজন মুসলিমের উইল বা ‘ওয়াসিয়্যাহ’ ইসলামি অর্থব্যবস্থায় কীভাবে ভূমিকা রাখে এবং আমাদের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তার প্রভাব কেমন।
১. ইসলামি উইল কী?
ইসলামি উইল বা ‘ওয়াসিয়্যাহ’ হলো একটি শরিয়তসম্মত বাধ্যতামূলক দলিল, যার মাধ্যমে একজন মুসলিম নিশ্চিত করে যে ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে তার মৃত্যুর পর তার অধিকার, উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং আল্লাহ তা’আলার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।
এই অধিকারসমূহ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে একজন মুসলিম উইল না রেখে মারা গেলে, তার সম্পদ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী নয় বরং ইংরেজি আইনের অধীনে ‘executor’ বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা বণ্টিত হবে। এতে করে যদি কোনো বৈবাহিক সঙ্গী বেঁচে থাকে, তাহলে সে পুরো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও জিনিসপত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে—যা ইসলামি বিধানের পরিপন্থি।
যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান, নাতি বা পরনাতি থাকে এবং সম্পদের মূল্য £২,৭০,০০০–এর বেশি হয়, তাহলে সঙ্গী পাবে:
- মৃত্যুপূর্ব ব্যক্তির সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও জিনিসপত্র
- মোট সম্পত্তির প্রথম £২,৭০,০০০
- অবশিষ্ট সম্পদের অর্ধেক
এর পাশাপাশি একটি স্ট্যান্ডার্ড ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স আছে, যা হলো ৪০%। এটি কেবল সেই অংশের উপর প্রযোজ্য যা £৩২৫,০০০–এর বেশি এবং যদি কেউ তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে বাড়ি দিয়ে যায়, তবে এই সীমা বাড়ানো যেতে পারে। সাধারণভাবে ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স দিতে হয় না, যদি:
- আপনার সম্পদের মূল্য £৩২৫,০০০–এর নিচে হয়
- আপনি £৩২৫,০০০–এর অতিরিক্ত সম্পদ আপনার স্ত্রী/স্বামী, সিভিল পার্টনার, কোনো চ্যারিটি বা স্থানীয় খেলার ক্লাবকে দিয়ে যান।
দুঃখজনকভাবে, একজন মুসলিম দম্পতি কেবল নিকাহ (ইসলামি বিবাহ) সম্পাদন করলেও, যদি তারা সিভিল রেজিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না করেন, তাহলে ইংরেজি আইনের দৃষ্টিতে তাদের বিবাহ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।
অতএব, দেখা যাচ্ছে উইল তৈরি করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষত এই কারণে যে, সঙ্গী যেন ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার পায় এবং সম্পত্তির দাবি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেন তাঁর সময়, টাকা ও স্বাস্থ্য অপচয় না হয়।
২. ইসলামে উইলের গুরুত্ব
ইসলামে উইলের গুরুত্ব বহু দিক থেকে উঠে এসেছে, যেমন:
ক. কুরআনে মৃত্যুর পর সম্পদ বণ্টনের সূক্ষ্ম বিবরণ সম্বলিত প্রায় ৩৫টি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় আয়াতুল মিরাস (মিরাসের আয়াতসমূহ)।
খ. নবি করিম ﷺ–এর বহু হাদিসে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে, যেমন আবদুল্লাহ ইবন উমর رضي الله عنه–এর হাদিসে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কোনো মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয় যে, তার অসিয়তযোগ্য কিছু রয়েছে আর সে দু’রাত কাটাবে অথচ তার কাছে তার অসিয়ত লিখিত থাকবে না।” [সহিহ বুখারি]
গ. সাহাবায়ে কিরাম رضي الله عنهم উইলের নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই তা কার্যকর করতে তৎপর হন।
৩. উইল প্রণয়নের হিকমতসমূহ
উইল প্রণয়নের পেছনে বহু হিকমত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু হলো:
ক. ফরজ আদায় করা
আমরা ইতিমধ্যে রাসূল ﷺ–এর পক্ষ থেকে উইলের গুরুত্ব ও বিধান সম্পর্কিত নির্দেশনা আলোচনা করেছি। এর পাশাপাশি ইসলামি ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো:
“যদি কোনো ফরজ আদায় করা অপর কোনো কাজের উপর নির্ভরশীল হয়, সে কাজটিও তখন ফরজ হয়ে যায়।”
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতে বলেন:
فَرِيضَةًۭ مِّنَ ٱللَّهِ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًۭا
এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরজ বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [সূরা নিসা: ১১]
একটি উইল আমাদেরকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে মৃত্যুর পরেও আল্লাহর বিধান কার্যকর থাকে। অতএব, যদি উইলের মাধ্যমে ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ হয়, তবে তা ইসলামে ফরজ বণ্টন বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।
খ. তাকওয়া অর্জন
মূলত, তাকওয়া হলো—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অসন্তুষ্ট করে এমন সমস্ত কিছু থেকে বিরত থাকা এবং যা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় তা সংরক্ষণ করা। ইসলামি উত্তরাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
تِلْكَ حُدُودُ ٱللَّهِ ۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدْخِلْهُ جَنَّـٰتٍۢ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَـٰرُ خَـٰلِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ ١٣ وَمَن يَعْصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدْخِلْهُ نَارًا خَـٰلِدًۭا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٌۭ مُّهِينٌۭ
এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সে সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য। আর কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করলে এবং তাঁর সীমা লঙ্ঘন করলে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং তার জন্য থাকবে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [সূরা নিসা: ১৩–১৪]
উইল তৈরি করা চিন্তাপূর্ণ পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতা প্রকাশ করে এবং নিজের কাজ ও তার পরিণতির প্রতি সচেতনতার পরিচায়ক। এটি তাকওয়ারই বাস্তব প্রকাশ।
গ. মানুষের হক সংরক্ষণ
ইসলামি ফিকাহ অনুসারে, উইল কার্যকর করার পূর্বে এবং সম্পদ বণ্টনের আগেই অন্যদের প্রতি দেনা-দায় পরিশোধ করতে হয়। বর্তমান যুগে ব্যবসায়িক, পারস্পরিক এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত লেনদেনে এমন অনেক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে ঋণ বা আর্থিক দায়বদ্ধতা সঠিকভাবে নথিভুক্ত বা সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত থাকে না।
অন্যের হক অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও দখলে রাখা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। তাই উইল এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত যাতে উত্তরাধিকারীরা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে কোনো দেনা বা আর্থিক দায় আছে কি না।
ঘ. উত্তরাধিকারীদের হক সংরক্ষণ
একইভাবে, অনেক সময় এমনও হয় যে কোনো ব্যক্তির কাছেও মানুষ পাওনাদার, কিন্তু সেই পাওনার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ বা স্বীকৃত নয়। ন্যায্যতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের দেনার প্রকৃতি সম্পর্কে উত্তরাধিকারীদের স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি, যাতে নিযুক্ত প্রতিনিধি সেগুলো আদায়ে উদ্যোগ নিতে পারে এবং মৃত ব্যক্তির সম্পদের প্রতি কারও হক বাকি না থাকে।
বর্তমানে একজন ব্যক্তির হাতে থাকতে পারে Sukuk, ISA, ভিন্ন দেশে বিভিন্ন সম্পত্তি, পেনশন, বিভিন্ন ধরনের শেয়ার, ট্রাস্টে জমাকৃত তহবিল—এমনকি আজকের ডিজিটাল যুগে ক্রিপ্টোকারেন্সিও থাকতে পারে।
আমাদের সম্পদকে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে বৈচিত্র্যময় করে তোলা উচিত যাতে এর সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া যায়। তবে এটি যেন এমন না হয় যে উত্তরাধিকারীরা সম্পদ খুঁজে পেতে বা বুঝে নিতে হিমশিম খায়। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, পরিবারের সদস্যদের জানানো জরুরি যে আপনি কী কী সম্পদের মালিক।
আমরা এমন বহু পরিস্থিতি দেখেছি যেখানে একজন মানুষ মারা গেছেন অথচ তার স্ত্রী বা পরিবার জানে না—তিনি কোথায় কী ইনভেস্ট করেছেন, কোথায় কী সম্পত্তি রয়েছে। কিছু সংস্কৃতিতে দেখা যায়, স্বামী তার স্ত্রীর কাছে তার সম্পদ বা অবস্থান গোপন রাখেন। মৃত্যুর পর এসব জানার প্রক্রিয়া পরিবারের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে, অনেক সময় মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, এমনকি কখনো কখনো এগুলো সম্পূর্ণ অজানাই থেকে যায়।
ঙ. ইসলামী শরিয়াহর সামগ্রিকতা অনুধাবন
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ…
তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত দাও… [সূরা আন-নূর: ৫৬]
কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তা’আলা সালাত ও যাকাতকে পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন, যা বোঝায় যে এ দুই ইবাদতের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই। বরং দুটিই আমাদের ইবাদতের পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অঙ্গ—সালাত শারীরিক ইবাদত, আর যাকাত আর্থিক ইবাদত।
ঠিক তেমনি, ইসলামে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানও শরিয়াহর অন্যতম অংশ—যা আমাদের পরিবার ও স্বজনদের হক সংরক্ষণ করে এবং সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এইসবই ইবাদতের একটি সম্মিলিত ধারা, যা আমাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গঠনে সহায়তা করে এবং তাঁর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত সেই অপার পুরস্কারের পথে এগিয়ে নেয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি সুপরিকল্পিত ও বিস্তারিত উইল পরিবারে সম্ভাব্য বিরোধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উইল না থাকলে পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তির ইচ্ছাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে—অনেকে সংস্কার বা ইসলাম-বহির্ভূত প্রথা অনুসরণ করতে চাইতে পারে, যা দ্বিধা ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সংস্কৃতিতে উত্তরাধিকার নিয়ে বড় বড় পারিবারিক বিরোধ হওয়াটা খুব সাধারণ।
একটি স্পষ্ট উইল এই বিভ্রান্তির সুযোগ রাখে না। এতে প্রতিটি অংশ কীভাবে বণ্টিত হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা থাকে। বিশেষ করে, কেউ চাইলে তার মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা কম—নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্মে দান করার ইচ্ছা রাখতে পারেন, সেটিও এতে উল্লেখ করা যায়।
উইল কেবল সম্পদের বণ্টন নয়, বরং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়েও হওয়া উচিত। যদি কেউ তার পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য কাউকে দায়িত্ব দেন, তাহলে তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত করতে পারবেন।
এটি আরও বিরোধ এবং ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারে, যেহেতু পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে “কে সম্পদ বণ্টন করবে”—এই বিষয়েও দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। যেমন: কোনো বাবা মনে করতে পারেন, মৃত সন্তানের সম্পদ তিনিই ভালোভাবে বণ্টন করতে পারবেন; কিন্তু তার পুত্রবধূ হয়তো এতে দ্বিমত পোষণ করেন। এতে পরিবারে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা সৃষ্টি হয়।
আপনি জীবিত থাকা অবস্থায় আপনার উইল এবং ইচ্ছাগুলো পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করলে, তারা কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকলে তা প্রকাশ করতে পারে। এই স্বচ্ছতা আপনার মৃত্যুর পর অপ্রত্যাশিত চমক ও বিরোধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যখন কোনো বিচ্ছিন্ন বাবা-মা, সাবেক স্ত্রীর সন্তান কিংবা বিদেশে বসবাসকারী দাদা-দাদি পর্যন্ত শরিয়াহ অনুসারে উত্তরাধিকার লাভ করে।
উইল নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে এবং এটি সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তারা যেন আত্মনির্ভরশীল হতে পারে, সেই প্রস্তুতিও আমাদেরকে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
উইলের চিন্তাভাবনা আমাদেরকে সন্তানদের এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে উদ্বুদ্ধ করে—যেখানে আমরা নির্ভয়ে, সহজভাবে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পদ সম্পর্কে আলোচনা করতে পারি; বরং এমন একটি ভুল ধারণা পোষণ না করি যে, তারা এখনও দায়িত্ববান হওয়ার যোগ্য নয় বা এ ধরনের আলোচনার জন্য উপযুক্ত নয়।
৩. উত্তরাধিকার বণ্টনের পূর্বশর্ত
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদ ও উত্তরাধিকার বণ্টনের পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। সেগুলো হলো:
ক. মৃত্যুর নিশ্চিত প্রমাণ
প্রথমত, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর একটি আনুষ্ঠানিক ও নিশ্চিত ঘোষণা থাকা প্রয়োজন। আধুনিক কালে এই নিশ্চিতকরণ একটি স্বীকৃত সরকারি কর্তৃপক্ষ—যেমন: চিকিৎসক, করোনার (ময়না তদন্তকারী), অথবা আইনগত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আসা উচিত। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই কর্তৃপক্ষ ও প্রক্রিয়াগুলো দেশের আইনি কাঠামো অনুসারে ভিন্ন হতে পারে।
প্রথমে এভাবে প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা কঠোর মনে হতে পারে, তবে উত্তরাধিকার তখনই কার্যকর হয় যখন কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুবরণ করেন। তাই, জীবিত না থাকার বিষয়টি স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়াহ এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে। নিখোঁজ ব্যক্তির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে এই ধরনের কড়াকড়ি প্রমাণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
খ. জীবিত উত্তরাধিকারী
উত্তরাধিকার পাওয়ার জন্য উত্তরাধিকারীর অবশ্যই জীবিত থাকা আবশ্যক— অসিয়তকারীর মৃত্যুকালে। যদি কোনো উত্তরাধিকারী তাঁর অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর জীবিত থাকে কিন্তু সম্পদ বণ্টনের পূর্বেই মারা যায়, তাহলে তার অংশ তার উত্তরাধিকারীদের মাঝে চলে যায়, যাতে তার হক সংরক্ষিত থাকে।
প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে গর্ভবর্তী সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে। সাধারণভাবে, যদি শিশু জীবিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, তবে সে সম্পদে অধিকার রাখে। সেক্ষেত্রে সম্পদ বণ্টন স্থগিত রাখা হয় যতক্ষণ না সন্তান জন্ম নেয়। যদি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে, তবে ঐ সন্তানের অংশ সংরক্ষিত রাখা হয়।
গ. সম্পত্তির অস্তিত্ব
কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, তার তারিকা (estate) তার ওয়ারেসগণের (ورثة) মাঝে স্থানান্তরিত হয়। ওয়ারেস হলো সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ, যাদের কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পদে অংশ পাওয়ার অধিকার আছে।
একজন ব্যক্তির সম্পত্তি বা তারিকা বলতে তার মৃত্যুকালে তার মালিকানাধীন সকল প্রকার সম্পদকে বোঝায়। এর মধ্যে আছে:
- রিয়েল স্টেইট: ঘরবাড়ি, জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি
- ব্যক্তিগত সম্পদ: গাড়ি, পোশাক, অলংকার, শিল্পকর্ম, সংগ্রহযোগ্য বস্তু, বই, ইলেকট্রনিক্স, আসবাবপত্র, পোষা প্রাণী ইত্যাদি
- আর্থিক সম্পদ: নগদ অর্থ, সোনা, ব্যাংক একাউন্ট, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন, ক্রিপ্টোকারেন্সি, NFT
- ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব: কোম্পানির শেয়ার, এলএলসি–তে অংশ, বা পার্টনারশিপের অংশ
- ডিজিটাল সম্পদ: কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পেটেন্ট ও অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ
- পাওনা বা ঋণের অধিকার: ব্যক্তি বা চুক্তিভিত্তিক যেকোনো দেনা বা পাওনা
এমনকি ক্ষুদ্র মূল্যমানের বস্তু যেমন মানিবক্সে থাকা খুচরা টাকা বা প্রিপেইড কার্ডের ব্যালেন্সও তারিকার অন্তর্ভুক্ত।
সংক্ষেপে, কোনো কিছু যদি মালিকানাধীন হয় বা নিয়ন্ত্রণে থাকে—তা যত ছোটই হোক না কেন, দৃশ্যমান বা অদৃশ্য, শারীরিক বা ডিজিটাল—সবই তারিকার অন্তর্গত।
প্রায় দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা আর্থিক সম্পদ ভাগ করে নেয় কিন্তু আবেগীয় সম্পর্ক আছে এমন পোশাক, অলংকার বা ঘড়ি নিজেরা রেখে দেন। অথচ এগুলোও সম্পত্তির অংশ এবং তা ওয়ারেসদের সম্মতিতে ভাগ না করে এককভাবে রাখা শরিয়তসম্মত নয়।
যদি কোনো উত্তরাধিকারী নির্দিষ্ট একটি সম্পদ যেমন একটি ঘড়ি রাখতে চায়, তবে সে চাইলে একটি চুক্তির মাধ্যমে ঐ সম্পদের মূল্য হিসাব করে তা তারিকা তহবিলে জমা দিয়ে নিতে পারে।
উপসংহার
এখানে শেষ হলো ইসলামি উইল নিয়ে ২ পর্বের এই ধারাবাহিক আলোচনার প্রথম পর্ব। এই পর্বে আমরা উইলের গভীর তাৎপর্য এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে তা কীভাবে বাস্তবায়িত হয় তা বিশ্লেষণ করেছি।
পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব:
- সম্পদ বণ্টনের অগ্রাধিকার
- কারা উত্তরাধিকার পাওয়ার যোগ্য
- অযোগ্যতার কারণসমূহ
- এবং কীভাবে আপনি নিজেই একটি ইসলামি উইল তৈরি করতে পারেন, সে সম্পর্কে পরামর্শ








No Comment! Be the first one.