আনাস ইবনে মালিক رضي الله عنه ছিলেন এক মহান সাহাবি, যিনি মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই নবি করিম ﷺ–এর খিদমতে ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি সরাসরি নবিজির আখলাক, আচার-আচরণ ও শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি নবিজির বর্ণিত হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ রাবি (বর্ণনাকারী)। তিনি মোট ২২৮৬টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে বুখারি ও মুসলিম একমত হয়েছেন ১৮০টি হাদিসে। বুখারি এককভাবে বর্ণনা করেছেন ৮০টি এবং মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন ৯০টি হাদিস।
কেউ যখন কারো খুব কাছের হয়, তখন সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তার সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়। এই চিন্তা থেকেই আমি খোঁজ নিতে শুরু করি, আনাস رضي الله عنه–কে নবি করিম ﷺ যে দোয়াগুলো শিখিয়েছিলেন, সেগুলোর প্রতি আমরা কীভাবে মনোযোগী হতে পারি।
নবি করিম ﷺ–এর পক্ষ থেকে আনাস رضي الله عنه–এর জন্য করা দোয়া:
اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ، وَبَارِكْ لَهُ فِيمَا أَعْطَيْتَهُ
“হে আল্লাহ! তার ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততির বৃদ্ধি কর, এবং তুমি যা তাকে দান করেছ, তাতে বরকত দাও।” [বুখারি]
আমরা আমাদের বাবা-মা এবং অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে আমাদের জন্য এই দোয়া করতে অনুরোধ করতে পারি, এবং আমরা আমাদের ছোটদের জন্যও এই দোয়া করতে পারি।
আনাস رضي الله عنه–কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, নবিজি ﷺ কোন দোয়াটি নিয়মিত করতেন, তিনি এই দোয়াটি উল্লেখ করেন:
اللَّهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
“হে আল্লাহ! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর, আখিরাতে কল্যাণ দান কর, এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।” [সহিহ মুসলিম]
আনাস رضي الله عنه অন্য কোনো দোয়া করলেও এই দোয়াটি তার সঙ্গে সংযুক্ত করে পড়তেন।
অন্যান্য বর্ণনা অনুযায়ী দোয়াটির বিভিন্ন রূপ:
اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ [সুনান আবু দাউদ]
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ [সহিহ মুসলিম]
একটি বিস্তৃত ও সার্বিক দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই দুঃখ, চিন্তা, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন থেকে।” [জামি আত-তিরমিজি]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكَسَلِ وَالْهَرَمِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَفِتْنَةِ الْمَسِيحِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই অলসতা, বার্ধক্যের দুর্বলতা, ভীরুতা, কৃপণতা, দাজ্জালের ফিতনা এবং কবরের আজাব থেকে।” [জামি আত-তিরমিজি]
ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দোয়া (সাইয়্যিদুল ইসতিগফার):
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَىٰ عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
হে আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোন হক্ব ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি আপনার বান্দা, আমি আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যতটা পারি তা রক্ষা করছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আমি আপনার দেওয়া নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন, কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। [বুখারি]
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ وَأَبُوءُ إِلَيْكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَىَّ وَأَعْتَرِفُ بِذُنُوبِي فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي إِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ
হে আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যতটা পারি তা পালন করছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আমি আপনার অনুগ্রহ স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করছি। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। [তিরমিজি]
রোগ থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া:
اللهم إني أعوذ بك من البرص والجنون، والجذام، وسيئ الأسقام
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেতব্যাধি, পাগলামি, কুষ্ঠরোগ এবং অন্যান্য কঠিন রোগব্যাধি থেকে। [আবু দাউদ]
আত্মার জন্য দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَقَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَدُعَاءٍ لاَ يُسْمَعُ وَنَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَؤُلاَءِ الأَرْبَعِ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে যা উপকারে আসে না, এমন অন্তর থেকে যা বিনয় প্রকাশ করে না, এমন দোয়া থেকে যা কবুল হয় না, এবং এমন আত্মা থেকে যা কখনো পরিতুষ্ট হয় না। হে আল্লাহ! আমি এই চারটি থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। [নাসাঈ]
শত্রুর বিরুদ্ধে বের হওয়ার সময় দোয়া:
اللهم أنت عضدي ونصيري، بك أحول وبك أجول وبك أصول، وبك أقاتل
হে আল্লাহ! আপনি আমার সহায় এবং সাহায্যকারী। আপনার সাহায্যে আমি শক্তি অর্জন করি, আপনার সাহায্যে আমি অগ্রসর হই, আপনার সাহায্যে আক্রমণ করি এবং আপনার সাহায্যেই আমি যুদ্ধ করি। [আবু দাউদ]
আনাস ইবনে মালিক رضي الله عنه থেকে বর্ণিত দোয়া করার কিছু আদব:
দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দোয়া করা
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন, নবি করিম ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউ যখন দোয়া করে, সে যেন দৃঢ়তার সাথে দোয়া করে এবং যেন না বলে: হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, তবে দান করুন— কেননা আল্লাহকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।” [সহিহ মুসলিম]
আল্লাহর সুন্দরতম নাম দিয়ে দোয়া করা
আনাস ইবনে মালিক رضي الله عنه বর্ণনা করেন: আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ–এর সঙ্গে বসা ছিলাম, এক ব্যক্তি নামাজ পড়ছিল এবং এরপর এই দোয়া করল:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ يَا ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ يَا حَىُّ يَا قَيُّومُ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, কারণ সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি অনুগ্রহকারী, আকাশ ও পৃথিবীর অনন্য স্রষ্টা, মহিমান্বিত ও সম্মানিত, চিরঞ্জীব ও স্থায়ী সত্তা। [আবু দাউদ, তিরমিজি]
اللَّهُمَّ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ
হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নন। আপনি অনুগ্রহকারী, আকাশমণ্ডলী ও ভূমণ্ডল সৃষ্টিকারী, মহিমা ও সম্মানের অধিকারী। [তিরমিজি]
রাসূল ﷺ বলেন: “এই ব্যক্তি আল্লাহর এমন একটি নামের মাধ্যমে দোয়া করেছে, যে নামের দ্বারা দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন এবং যে নামের মাধ্যমে কিছু চাওয়া হলে আল্লাহ তা প্রদান করেন।” [আবু দাউদ]
আল্লাহকে ডাকবার আদব
আনাস ইবনে মালিক رضي الله عنه থেকে বর্ণিত: উম্মে সুলাইম নবি করিম ﷺ–এর নিকট এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে কিছু শব্দ শিখিয়ে দিন, যা আমি নামাজে দোয়া হিসেবে পড়তে পারি।”
তিনি ﷺ বললেন, “সুবহানাল্লাহ দশবার, আলহামদুলিল্লাহ দশবার, আল্লাহু আকবার দশবার বলো, এরপর যা চাও, তা আল্লাহর কাছে চাও। তখন তিনি বলবেন: ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।” [সুনান আন-নাসাঈ]
দোয়ার সর্বোত্তম সময়
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন, নবি করিম ﷺ বলেছেন: “আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে করা দোয়া কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না।” [আবু দাউদ]
দোয়ার সময় হাত উঠানো
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন: আমি নবি করিম ﷺ–কে দোয়ারত অবস্থায় তাঁর হাত এমনভাবে উঁচু করতে দেখেছি যে, তাঁর বগলের সাদা অংশ দেখা যাচ্ছিল। [সহিহ মুসলিম]
শাহাদাত কামনার দোয়া
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন, নবি করিম ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে শাহাদাতের জন্য দোয়া করে, আল্লাহ তাকে শাহীদের মর্যাদা দান করবেন, যদিও সে যুদ্ধের ময়দানে শাহীদ না হয়।” [সহিহ মুসলিম]
অন্যদের জন্য দোয়া করে বরকত লাভ
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন, মুহাজিরগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আনসারগণ তো সব সওয়াব নিয়ে গেল!” নবি করিম ﷺ বললেন, “না, যতক্ষণ তোমরা তাদের জন্য দোয়া করো এবং তাদের প্রশংসা করো, ততক্ষণ নয়।” [আদাবুল মুফরাদ]
রুকইয়ার দোয়া
আনাস رضي الله عنه বর্ণনা করেন, আমি সাবিতকে বললাম, “আমি কি তোমার ওপর রুকইয়া করব না? যেমন নবি করিম ﷺ দোয়া পড়তেন।” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, করো।” তখন আনাস এই দোয়াটি করলেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، مُذْهِبَ الْبَأْسِ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
“হে আল্লাহ! মানুষদের রব! কষ্ট দূরকারী! আপনি রোগ দূর করুন, আপনিই হচ্ছেন আরোগ্যদাতা। আপনার ছাড়া কেউ আরোগ্য দিতে পারে না। আপনি এমন আরোগ্য দিন, যা কোনো রোগ রেখে না যায়।” [বুখারি]








No Comment! Be the first one.