আপনি কি শিরোনামটা ঠিক পড়েছেন, নাকি লেখক আসলে ঈসা (যীশু) عليه السلام-এর পানির ওপর চলার ঘটনা (যা খ্রিস্টানদের দাবি) অথবা মূসা عليه السلام-এর সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনা বলতে চেয়েছেন?
না, এই লেখায় আলোচনা হবে এমন কিছু মানুষের ব্যাপারে, যারা সত্যিকার অর্থেই টাইগ্রিস নদী হেঁটে পার হয়েছিলেন—তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক মহান সেনাপতি। কিন্তু অলৌকিক ঘটনা তো শুধু নবিদের সঙ্গেই ঘটে, তাই না? তাহলে এসব লোক কীভাবে এমন কিছু ঘটাতে পারলেন?
অলৌকিকতা (মুজিযা) কী?
মুজিযা (معجزة) হলো একটি অসাধারণ ঘটনা, যা শুধুমাত্র নবি ও রাসূলদের হাতেই সংঘটিত হয়। এর মাধ্যমে তাদের বার্তা সত্য বলে প্রমাণিত হয় এবং তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করা হয়। এ ধরনের নিদর্শন রাসূলগণের পরে আর কাউকে প্রদান করা হবে না, কারণ রাসূল ﷺ -এর পরে কেউ যদি নবুওয়তের দাবি করে, সে মিথ্যাবাদী ও কাফির।
তবে, উলামারা আরেকটি শব্দ ব্যবহার করেন—কারামাহ (كرامة)। এটি আল্লাহর ওলিদের জন্য এক সম্মান; অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর কিছু বান্দার জন্য যে অলৌকিকতা নিয়ে আসেন, তা তাদের জন্য এক সম্মান এবং তাদের দ্বীনি কাজে সাহায্যসরূপ। কারামাহ অনেক রকমের হতে পারে। অতীতের অনেক ওলি-আলেম ও মুজাহিদের জীবনীতে আমরা এমন ঘটনা শুনে থাকি। এগুলো পূর্ববর্তী উম্মতেও ছিল, এই উম্মতেও আছে, এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
এই মহান সেনাপতি কে ছিলেন?
তিনি হলেন সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস رضي الله عنه—জীবিত থাকতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের একজন। তিনি ইসলামের প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অনেক গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তবে তিনি কখনো নিজের গুণাবলি নিয়ে অহংকার প্রকাশ করতেন না—শুধু দুটি বিষয়ে ব্যতিক্রম করেছেন।
প্রথমত, তিনি ছিলেন আল্লাহর পথে প্রথম বর্শা নিক্ষেপকারী এবং তিনিই প্রথম আল্লাহর রাস্তায় আঘাতপ্রাপ্ত। দ্বিতীয়ত, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—”সা‘দ, নিক্ষেপ করো! আমার পিতা ও মাতা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোনো কাজে খুশি হয়ে দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ! তাঁর বর্শাকে নির্ভুল করো এবং তাঁর দোয়া কবুল করো।” এরপর থেকে সাহাবাদের মধ্যে তিনি নিজের দোয়ার কবুল হওয়ার জন্য বিখ্যাত হয়ে যান। তিনি ছিলেন একজন সাহসী, মুত্তাকি এবং মহান ফকিহ।
সেই বিখ্যাত যুদ্ধ
আল-মাদায়েন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল আল-কাদিসিয়াহ যুদ্ধ-এর দুই বছর পর। এই সময়ে মুসলিম ও পারসিকদের মধ্যে একের পর এক লড়াই চলছিল। শেষে পারসিক বাহিনীর অবশিষ্ট অংশ মাদায়েন শহরে একত্রিত হয়, যা ছিল সেই যুদ্ধের চূড়ান্ত দৃশ্য।
সা‘দ رضي الله عنه ছিলেন মুসলিম বাহিনীর প্রধান। তিনি বুঝতে পারেন, সময় পারসিকদের পক্ষেই কাজ করছে, তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তাঁদের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে ছিল—বন্যায় ভরপুর টাইগ্রিস নদী। পারসিকরা নদী পার হয়ে নিজেদের অঞ্চলে গিয়ে পুল ধ্বংস করে দেয় এবং সব নৌকা ডুবিয়ে দেয়—যাতে মুসলমানরা পার হতে না পারে। এ পর্যায়ে শুরু হয় সেই অলৌকিক ঘটনা — টাইগ্রিস নদী হেঁটে পার হওয়া, যা মূলত ছিল কারামাহ।
সাহাবিদের কিছু স্কাউট (গোপ্তচর) সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস رضي الله عنه-এর নিকট এসে বলল,
“আমরা তাদের পেছনে আর যেতে পারছি না। তাদের রক্ষা করছে একপ্রকার সমুদ্র (টাইগ্রিস নদী), তারা সব সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে এবং সব নৌকাও ডুবিয়ে দিয়েছে। আমাদের আর সামর্থ্য নেই তাদেরকে ধাওয়া করার।”
সা‘দ رضي الله عنه তখন সালমান আল-ফারসি رضي الله عنه-কে ডাকলেন। যেহেতু তিনি পারস্যের মানুষ ছিলেন, পারসিকদের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে ভালো জানতেন। তিনি তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলেন। কিন্তু সালমান رضي الله عنه স্পষ্ট কোনো কৌশল দিতে পারলেন না—তিনি শুধু এই পরামর্শ দিলেন, “সেনাবাহিনী যেন আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা অনুসরণ করে চলে।”
এই কথাটি সাধারণ পরামর্শ মনে হতে পারে, কিন্তু বদরের যুদ্ধ স্মরণ করলে বোঝা যায়, এমন মুহূর্তেই অলৌকিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এবং এই কথাটিই প্রমাণিত হলো—এখনো পর্যন্ত এটাই মানুষের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী পরামর্শ।
তারপর সালমান رضي الله عنه রাতের বেলা সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখতে শুরু করলেন—তিনি দেখলেন,
রাতে তারা সালাতে রুকু-সিজদায় লিপ্ত থাকে, আর দিনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। এভাবে তিন রাত পর্যবেক্ষণের পর তিনি সা‘দ رضي الله عنه-কে জানালেন, “সেনাবাহিনীর অবস্থা ভালো; তারা দ্বীনের উপর রয়েছে।”
টাইগ্রিস নদী পার হওয়ার অলৌকিক মুহূর্ত
এরপর যা ঘটতে যাচ্ছিল, সেই ঘটনায় সাহাবিদের ইমান দেখে যে কাউকে স্তব্ধ হয়ে যাবে। সা‘দ رضي الله عنه-এর ইমান ও সংকল্প ছিল দুর্বার; তিনি যেন অসম্ভব বলে কিছুতেই বিশ্বাসই করতেন না।
তিনি সেনাবাহিনীকে একত্রিত করে বললেন: “আমি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তিনবার তাকবির দিব। তারপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে নদী পার হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের জন্য এটি সহজ করে দেবেন।”
তাঁরা নদীর পাড়ে দাঁড়ালেন, সা‘দ رضي الله عنه তিনবার তাকবির দিলেন। এরপর সবাই বলল, “বিসমিল্লাহ”
তারা নদীতে প্রবেশ করল—ঘোড়ার পিঠে থাকা সাহাবারা এবং পায়ে হেঁটে থাকা সাহাবারা প্রবাহিত পানির উপর দিয়ে চলতে শুরু করল। তাদের ধরে রেখেছিলেন সেই সত্তা, যিনি আসমানকে ধরে রেখেছেন যেন তা আল্লাহর আদেশ ছাড়া ভূমির ওপর পতিত না হয়।
বিচক্ষণ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা কৌশল
নদী পার হওয়ার আগে, সা‘দ رضي الله عنه একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি নিলেন। তিনি জানতেন, নদীর ওপারে শত্রুর ঘাঁটি রয়েছে, তাই আগেভাগেই সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুইটি বিশেষ দল পাঠালেন:
- ‘আসিম ইবনে ‘আমর رضي الله عنه-এর নেতৃত্বে “ভীতি প্রদর্শনকারী দল” (ফারক্বাতুর রু‘ব)।
- আল-ক্বা‘ক্বা‘ ইবনে ‘আমর رضي الله عنه-এর নেতৃত্বে “নীরব দল” (ফারক্বাতুস সুম্ম)।
ইতিহাসবিদগণ বলেন: যদি কোনো ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়ত, আল্লাহ নদীর মাঝে তাদের জন্য একটি দ্বীপ বানিয়ে দিতেন, যেখানে তারা বিশ্রাম নিয়ে শক্তি ফিরে পেত। তারপর আবার নদী পার হতো।
সা‘দ رضي الله عنه সবাইকে বললেন, “আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম ভরসাস্থল।”
এরপর তিনি নিজেই ঘোড়াসহ নদীতে প্রবেশ করলেন এবং সবাই তাঁর পেছনে অনুসরণ করলেন। কেউই পিছনে রইল না।
তারা এমনভাবে হেঁটে চলছিলেন, যেন মাটির উপর চলছেন। সৈন্যের সংখ্যায় দুই তীরের মাঝের পুরো এলাকা পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এত বেশি ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক ছিল যে, পানির পৃষ্ঠও আর দেখা যাচ্ছিল না।
তারা চলতে চলতে আলাপ-আলোচনাও করছিলেন, এমন নির্ভারতা ও নিরাপত্তার অনুভূতিতে তারা ভরপুর ছিলেন। তাদের এই দৃঢ় তাওয়াক্কুল, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও সাহায্যের উপর বিশ্বাস—এটাই আল্লাহর সাহায্য লাভের প্রকৃত উপায়।
সালমান আল-ফারসি رضي الله عنه-এর বিস্ময়
এই দৃশ্য দেখে সালমান আল-ফারসি رضي الله عنه অত্যন্ত বিস্মিত হন। আর কে হবে না!
তিনি মাথা নাড়িয়ে বিস্ময়ে বললেন, “ইসলাম তো এখনো নতুন! আল্লাহর কসম, স্থল যেমন তাদের অধীন হয়েছে, তেমনি সমুদ্রও তাদের অধীন হয়েছে। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে সালমানের প্রাণ, তারা যেভাবে একসঙ্গে নদীতে প্রবেশ করেছে, সেভাবেই একসঙ্গে বেরিয়ে আসবে।”
কিছু বর্ণনায় এসেছে, টাইগ্রিস নদীতে এমন কিছু অগভীর স্থান (পাড় বা ‘ফোর্ড’) ছিল, যেখানে জোয়ারের সময় পানি অনেক বেড়ে যেত এবং ঘোড়ার গায়ের সমান উচ্চতা পর্যন্ত উঠে যেত। আর সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস رضي الله عنه যখন নদীতে প্রবেশ করেন, তখন সেটি জোয়ারের সময় ছিল। তবে এটা সম্ভব, তারা কিছু নির্দিষ্ট অগভীর স্থান দিয়েই পার হয়েছিলেন; যদিও বেশিরভাগ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়—তারা উঁচু পানির মধ্য দিয়েই হেঁটে নদী পার হন।
এক সাহাবির কাঠের পেয়ালা পানিতে পড়ে যায়। তিনি মন খারাপ করে বললেন, “আমি হচ্ছি একমাত্র ব্যক্তি, যার কিছু হারাল!”
তিনি তাঁর সাথীদের ডেকে বললেন তাকে সাহায্য করতে। এমন সময় হঠাৎ একটা বড় ঢেউ সেই পেয়ালাটিকে ঠেলে এমন জায়গায় নিয়ে আসে, যেখান থেকে সেটা আবার উঠিয়ে নেওয়া যায়!
নদী পার হওয়ার পর পারসিকদের প্রতিক্রিয়া
যখন মুসলিমরা নদী পার হয়ে পৌঁছে গেলেন, পারসিক সেনারা হতবাক হয়ে গেল এবং আতঙ্কে ছুটে পালাতে লাগল। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, “তোমরা মানুষ নও, বরং জিনদের সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে! কারণ কোনো মানুষই এমনভাবে নদী পার হতে পারে না, যেখানে বাস্তবিক কোনো উপায় নেই!”
সা‘দ رضي الله عنه-এর সালাত এবং জুমা
সা‘দ رضي الله عنه বিজয়ের পর রাজপ্রাসাদের কেন্দ্রে এসে সালাতুল ফাতহ (বিজয়ের নামাজ) আদায় করলেন—এটি ছিল আট রাকাত বিশিষ্ট সালাত। তিনি ১৬ হিজরি সালের সফর মাসে ইরাকের এই প্রাসাদেই প্রথম জুমার সালাত আদায় করেন। এটি ছিল ইরাকের ইতিহাসে প্রথম জুমার নামাজ।
খসরুর রাজমুকুট
এই অভিযানের সময় তারা পারসিক রাজা খসরুর রাজমুকুট দখল করেন। এটি এতটাই বড় ও ভারী ছিল যে একটি উট এটি বহন করতে পারছিল না। তাই তাঁরা দুইটি উটের মাঝে বেঁধে এই রাজমুকুটকে বয়ে নিয়ে যান—যেভাবে কাফেলার মাল বহন করা হয়। তাঁরা এটি পৌঁছে দেন মদীনার খলিফা, আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব رضي الله عنه-এর নিকট।
এই মহান সাহাবি, সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস رضي الله عنه-কে দাফন করা হয়েছিল এবং কাফন দেওয়া হয়েছিল বদরের যুদ্ধে পরিধান করা সেই জামাটি দিয়ে, যা তিনি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন কেবল মৃত্যুর সময় ব্যবহার করার জন্য।
তিনি তাঁর রবের সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন, যা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি পছন্দসই ছিল।
তাঁকে দাফন করা হয় মদীনার পবিত্র বাকি কবরস্থানে, তাঁর অন্যান্য সাহাবি সাথীদের পাশে। আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ حَبِيبِكَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
হে আল্লাহ! আমাকে তোমার পথে শাহাদাত দান করো এবং আমার মৃত্যু তোমার প্রিয় নবি ﷺ-এর শহরে করো।
এইভাবেই শেষ হয়েছিল আসাদের সিংহ সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস رضي الله عنه-এর জীবন—
যিনি ছিলেন আল্লাহর পথে প্রথম তীর নিক্ষেপকারী, আল-মাদাঈনের বিজয়ী, এবং পারস্যের পূজিত অগ্নির নির্বাপক!
হে আল্লাহ! আমাদের সেই ইমান ও দৃঢ়তার অধিকারী করো, যা ছিল সাহাবিদের পরিচয় ও সালাফদের জীবন্ত আদর্শ। হে আল্লাহ! আমাদের তোমার নিদর্শন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাহ ও শিক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার তৌফিক দাও—যা আমাদের ইমান, ইয়াকিন ও তোমার প্রতি ভালোবাসায় বৃদ্ধি করে। হে সব কিছুর প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।








No Comment! Be the first one.