তাকদিরের পরিবর্তনসমূহ
আমরা সুন্নাহ থেকে একাধিক ঘটনায় শিখি যে, কিছু আমলের মাধ্যমে তাকদিরের কিছু অংশ পরিবর্তিত হতে পারে। এখানে যে তাকদিরের কথা বলা হচ্ছে তা হলো “তাকদির মু‘আল্লাক” বা “ইরাদাহ শারইয়্যাহ”। আল্লাহ বলেন—
يَمْحُوا۟ ٱللَّهُ مَا يَشَآءُ وَيُثْبِتُ ۖ وَعِندَهُۥٓ أُمُّ ٱلْكِتَبِ
“আল্লাহ যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা স্থির রাখেন; এবং তাঁর নিকট রয়েছে মূল গ্রন্থ (লাওহে মাহফুয)।”
[সূরা রা’দ, ৩৯]
লাওহে মাহফুযে যা লেখা হয়েছে, তা কখনো পরিবর্তিত হয় না।
কিন্তু কিছু বিষয়ে আল্লাহ তাআলা কিছু কারণ নির্ধারণ করেছেন, যেগুলো পূরণ হলে নির্দিষ্ট ফলাফল এসে যায়। আল্লাহর ক্বদরের মধ্যে এই কারণ এবং ফলাফল উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, ক্বদরে নির্ধারিত থাকে—ফলাফলটি ঘটবে কারণ এর উপযুক্ত শর্ত পূরণ হয়েছে, এবং ঠিক উল্টোভাবেও ব্যাপারটি সত্য।
কোনো শর্ত পূর্ণ হলে, তা শুধুমাত্র সেই তাকদিরকে পরিবর্তন করে যা তখন হতো না যদি সেই শর্ত পূর্ণ না হতো। দিনশেষে, উভয় অবস্থাই আল্লাহর কাছে লেখা থাকে।
উদাহরণস্বরূপ: একজন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করে। যদি সে কিছু শর্ত পূর্ণ করে (যেমন সদকা দেয়), সে ৭০ বছর বাঁচবে। যদি তা না করে, তবে ৫০ বছর বাঁচবে। কিন্তু এই দুটি সম্ভাবনার মধ্যে মাত্র একটিই ঘটবে এবং সেটিই লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ থাকে।
আল্লাহ ফেরেশতাদের এসব বিস্তারিত জানিয়ে দেননি। তাই আমরা কুরআন ও হাদীস থেকে দেখি যে, ফেরেশতাদের নিকট যে লিখিত তাকদির থাকে, তা কখনো একটি নির্দিষ্ট হুকুমে থাকে; কিন্তু যখন কোনো শর্ত পূর্ণ হয়, তখন আল্লাহর নির্দেশে তারা সেটি পরিবর্তন করেন। শর্ত পূরণ, তাকদিরের পরিবর্তন এবং চূড়ান্ত তাকদির—সবই পূর্ব থেকেই লাওহে মাহফুযে লেখা আছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “চিকিৎসা ক্বদরের অংশ; তা আল্লাহর অনুমতিতে উপকার দেয়।” [তাবারানি]
ইমাম ইবনেল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় চমৎকারভাবে বলেন—
“কিছু মানুষ মনে করে, চিকিৎসা কোনো উপকারে আসে না, কারণ নির্ধারিত হয়ে গেছে কারো আরোগ্য হবে কি না। তারা মনে করে, যেহেতু অসুস্থতা আল্লাহর ক্বদরে আসে, তাই তা বাধা দেয়া যায় না। রাসূল ﷺ এই ভুল ধারণাকে পরিপূর্ণভাবে খণ্ডন করেছেন—তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, চিকিৎসা, রুকইয়া এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা—সবই আল্লাহর ক্বদরের অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলোর কোনোটিই আল্লাহর ক্বদরের বিরোধী নয়। বরং আল্লাহর ক্বদরকে আল্লাহর ক্বদর দ্বারাই প্রতিহত করা যায়।”
একবার উমর ইবনেল খাত্তাব رضي الله عنه সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পৌঁছে জানতে পারেন সেখানে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তখন তিনি মদিনায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় আবু উবায়দা ইবনেল জাররাহ رضي الله عنه বলেন,
“আপনি কি আল্লাহর ক্বদর থেকে পালাচ্ছেন?”
উমর رضي الله عنه উত্তরে বলেন, “হে আবু উবায়দা! যদি এই কথা অন্য কেউ বলত… হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর ক্বদর থেকে আল্লাহর ক্বদরের দিকেই পালাচ্ছি।” [বুখারি]
এমন কিছু আমল রয়েছে, যা তাকদির মু‘আল্লাকের উপর প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে একটি হলো:
১. দুআ
আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا۟ لِى وَلْيُؤْمِنُوا۟ بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
“আর আমার বান্দারা যখন তোমার নিকট আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, তখন (তাদের বলে দাও) আমি তো কাছেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। অতএব তাদের উচিত আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া ও আমার প্রতি ঈমান আনা, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।” [সূরা আল-বাকারা, ১৮৬]
রাসূল ﷺ বলেছেন: “কোনো কিছুই তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না, দুআ ব্যতীত।” [আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি]
দুআ এবং তাকদিরের সম্পর্ক
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“যার জন্য দুআর দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, তার জন্য রহমতের দরজাও খুলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কাছে যা কিছু চাওয়া হয়, এর মধ্যে এমন কিছু নেই যা তাঁর কাছে সুস্থতা ও নিরাপত্তা চাওয়ার চেয়ে বেশি প্রিয়। দুআ তাকদিরে নির্ধারিত বিষয় এবং নির্ধারিত নয় এমন বিষয় উভয় ক্ষেত্রেই উপকারে আসে। সুতরাং, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা অবশ্যই দুআ করো।” [তিরমিজি]
রাসূল ﷺ আরও বলেন:
“কেবলমাত্র নেক আমলই জীবনকাল বাড়ায়, আর কেবল দুআই তাকদির প্রতিহত করতে পারে। আর একজন মানুষ কোনো গুনাহর কারণে তার রিজিক থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।” [ইবনে মাজাহ]
তিনি ﷺ আরো বলেন:
“কোনো সাবধানতাই আল্লাহর তাকদির থেকে রক্ষা করতে পারে না। দুআ সেই তাকদিরে নির্ধারিত বিষয় এবং অনির্ধারিত বিষয় উভয়ের জন্যই উপকারী। দুআ নির্ধারিত বিপদ-আপদের মুখোমুখি হয় এবং তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত লড়াই করে।” [তাবারানি]
আবু উসমান আল-হিন্দি বলেন, তিনি দেখেছেন, উমর ইবনেল খাত্তাব رضي الله عنه কা’বার চারপাশে তাওয়াফ করছেন এবং কাঁদছেন। তিনি বলছেন—
“হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাকে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করে লিখে থাকেন, তবে তা যেন স্থির থাকে। আর যদি আপনি আমাকে পাপীদের ও হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করে লিখে থাকেন, তবে তা মুছে দিন এবং আমাকে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন। নিশ্চয়ই আপনি যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা স্থির রাখেন। আর আপনার কাছেই আছে ‘উম্মুল কিতাব’ (মূল গ্রন্থ)।”[জামে আল-বায়ান]
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ رضي الله عنه দুআ করতেন:
“হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাকে হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করে লিখে থাকেন, তবে তা মুছে দিন এবং আমাকে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন।” [আল-মু‘জাম আল-কবীর]
আল-হাফিয ইবন হাজার رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন:
“বিপদ প্রতিহত করার জন্য দুআ করা ঠিক তেমন, যেমন একটি ঢাল দিয়ে তীর প্রতিহত করা হয়। ক্বদরের প্রতি বিশ্বাসী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তুমি তীর বহন করবে না বা নিজেকে ঢাল দিয়ে রক্ষা করবে না।” [বাযলুল মা‘উন]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুআ তাকদিরকে প্রভাবিত করে, কিন্তু তাকদিরে যা লেখা হয়েছে, তার পরিবর্তনটিও আগেই লেখা থাকে এবং নির্ধারিত থাকে। অর্থাৎ, দুআর মাধ্যমে নতুন কোনো তাকদির সৃষ্টি হয় না—বরং আগে থেকেই লেখা থাকে যে, যখন দুআ করা হবে, তখন আল্লাহ এই পরিণতি নির্ধারণ করবেন। যিনি পরীক্ষার তাকদির নির্ধারণ করেছেন, তিনিই সেই পরীক্ষার প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে দুআ নির্ধারণ করেছেন। অতএব, আল-কদা ও আল-ক্বদর উভয়ই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
এটা এমনভাবে কল্পনা করা যায়—যেমন একটি নির্ধারিত গন্তব্য বা মাইলস্টোন আছে, যা পূরণ হতে হলে কিছু চেকবক্স পূরণ করতে হবে। আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এই চেকবক্সগুলো পূরণ করার অথবা না করার। আমরা যদি সব চেকবক্স পূরণ করি, তাহলে গন্তব্যটি ঘটে। আর না করলে, তার দায় আমাদের। সেই চেকবক্সগুলোর একটি হলো আল্লাহর কাছে দুআ করা, যা আমাদের করতেই হবে।
উদাহরণ:
রোগব্যাধি ও ক্ষত এগুলো পূর্বনির্ধারিত। একজন অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আরোগ্যের জন্য দুআ করে। অসুস্থতা আগে থেকেই লেখা ছিল, তার দুআও লেখা ছিল এবং এই দুআর কারণে আল্লাহ তার আরোগ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তাই সবকিছুই একটি নির্ধারিত কারণের সঙ্গে সংযুক্ত—আর সেই কারণগুলোও সৃষ্ট ও নির্ধারিত।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া رَحِمَهُ اللَّهُ -কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “রিজিক কি বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে?”
তিনি উত্তর দেন: রিজিক দুই প্রকার:
১. যেটি আল্লাহ জানেন যে তিনি দেবেন—এটি পরিবর্তন হয় না।
২. যেটি তিনি ফেরেশতাদের লিখতে বলেন—এটি কারণের ভিত্তিতে বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে।
যদি আল্লাহ ফেরেশতাদের আদেশ দেন—অমুকের জন্য রিজিক লিখো, যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে—তাহলে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে রিজিক বৃদ্ধি পাবে।
সহিহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”
যেমন উমর রা. বলেছিলেন: “হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাকে হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করে লিখে থাকেন, তবে তা মুছে দিন এবং আমাকে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন, কারণ আপনি যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা স্থির রাখেন।”
এমনকি, দাউদ عليه السلام –এর জীবনকালও ৬০ বছর বাড়ানো হয় এবং তা ৪০ থেকে ১০০ বছর করা হয়।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের দুই চোখের মাঝখানে ঈমানের একটি আলো রেখেছিলেন এবং (রুহের জগতে) আদম عليه السلام -কে তাঁর সব সন্তানদের দেখালেন। আদম عليه السلام এই অসংখ্য আলোযুক্ত মানুষ দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রভু! এরা কারা?’ আল্লাহ বললেন, ‘এরা তোমার বংশধরেরা।’ আদম তাদের একজনের প্রতি মনোযোগ দিলেন যার আলো তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি বললেন, ‘হে আমার রব, সে কে?’ আল্লাহ বললেন, ‘সে তোমার সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ জাতির একজন, যার নাম দাউদ।’ আদম বললেন, ‘তার আয়ু কত?’ আল্লাহ বললেন, ‘ষাট বছর।’ তখন আদম বললেন, ‘হে আমার রব! আমার আয়ু থেকে চল্লিশ বছর তাকে দিয়ে দিন।’”
কিন্তু যখন আদম عليه السلام -এর আয়ু শেষ হলো এবং মালাকুল মাওত (মৃত্যুর ফেরেশতা) এলেন, তখন তিনি বললেন, ‘আমার তো চল্লিশ বছর বাকি ছিল!’ ফেরেশতা বললেন, ‘তুমি কি তা দাউদকে দাওনি?’ আদম তা অস্বীকার করলেন, এবং তার সন্তানরাও আল্লাহর সাথে তাদের প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করল। আদম তাঁর প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেন এবং তাঁর সন্তানরাও ভুলে গেল, ফলে তারা ভুলের মধ্যে পতিত হলো।” [তিরমিজি]
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, তাকদির পূর্বেই লাওহে মাহফুজে লেখা ছিল—আদম (আ.) দাউদ (আ.)-কে তাঁর জীবনের চল্লিশ বছর দান করবেন—এটা ৫০,০০০ বছর আগেই নির্ধারিত। কিন্তু এর বাস্তবায়ন ঘটেছে আদম (আ.)-এর নিজ ইচ্ছায়। তাই এই ঘটনায় দুই ধরণের তাকদির বোঝা যায়:
- তাকদির কাওনিয়্যাহ ( الكونية ) – যা বাস্তবভাবে সংঘটিত হয় ও রচিত হয় আসমানে।
- তাকদির শারইয়্যাহ ( الشرعية ) – যেখানে মানুষ নিজ ইচ্ছায় সৎ বা অসৎ কাজ বেছে নেয় এবং এর ফল পায়।
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” [বুখারি]
ইবন উমর রা. বলেন: “যে ব্যক্তি তার রবকে ভয় করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তার আয়ু বৃদ্ধি পায়, তার সম্পদে বরকত আসে, এবং তার পরিবার তাকে ভালোবাসে।” [আদাবুল মুফরাদ]
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. ব্যাখ্যা করেন: রিজিক ও জীবনকাল দুই প্রকার:
১) যেটি আল্লাহর ‘উম্মুল কিতাব’-এ লিপিবদ্ধ—এটি পরিবর্তন হয় না।
২) যেটি ফেরেশতাদের জানানো হয়—এটি বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে কিছু বিশেষ আমলের কারণে।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ ফেরেশতাকে আদেশ দেন: “এই বান্দার জন্য তার রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি লিখো—যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” কিন্তু ফেরেশতা জানে না সেই ব্যক্তি আসলেই এই সম্পর্ক বজায় রাখবে কি না। কেবল আল্লাহ জানেন চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে।
ইমাম ইবন হাজার رَحِمَهُ اللَّهُ (ফাতহুল বারি) বলেন: “ফেরেশতাকে আদেশ দেয়া হয়, যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে তবে তার আয়ু ১০০ বছর, আর যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে ৬০ বছর। আল্লাহর ইলমে এটি আগেই নির্ধারিত থাকে সে কোনটি করবে। আল্লাহর ইলম অপরিবর্তনীয়। পরিবর্তন কেবল ফেরেশতাদের জানানো তথ্য-তে হয়।
এই ব্যাখ্যাই আল্লাহর বাণী দ্বারা সমর্থিত:
يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَعِندَهُ أُمُّ الْكِتَابِ
“আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা স্থির রাখেন; আর উম্মুল কিতাব তাঁর নিকটেই আছে।” [সূরা রা’দ, ৩৯]
৩. উল্কাপিণ্ড (Shooting Stars) ও তাকদিরের সাথে এর সম্পর্ক নেই
উল্কাপিণ্ড দেখা ও মন থেকে কিছু চাওয়া (wish making) তাকদিরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
ইমাম ইবন মুফলিহ رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন:
“কাফেরদের কাজের মধ্যে একটি হলো—যখন তারা উল্কাপিণ্ড দেখে, তখন চোখ বন্ধ করে কিছু কামনা করে। এটি ভিত্তিহীন এবং এমন বিশ্বাস রাখা যে তারকা মানুষের তাকদিরকে প্রভাবিত করে কিংবা তারকারা মানুষের মনের কথা জানে—এটা কুফর। এই বিশ্বাস বিদআত ও শিরকের পথ।” [সংক্ষিপ্ত, আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ]
তাই একজন মুসলিমের জন্য উল্কাপিণ্ড দেখে কামনা করা বা এর মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারিত হয় মনে করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আল্লাহ ছাড়া কেউ তাকদির নির্ধারণ করতে পারে না, এবং কোনো সৃষ্টিই এতে প্রভাব ফেলতে পারে না।
৪. তাকদির যদি অপছন্দনীয় হয়?
তাকদিরের কোনো ঘটনা যদি আমাদের কাছে কষ্টকর বা অপছন্দনীয় মনে হয়, তবে তা কিভাবে দেখা উচিত?
ইমাম ইবনেল কাইয়্যিম رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন, একজন মু’মিনের উচিত সেই অবস্থা সম্পর্কে ছয়টি দৃষ্টিভঙ্গি (considerations) রাখা:
ক) توحيد (তাওহীদ) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“আল্লাহই এ তাকদির নির্ধারণ করেছেন, আল্লাহ চেয়েছেন বলেই এটা হয়েছে, এবং আল্লাহ যা চান তাই ঘটে, আর যা চান না তা কখনও ঘটে না।”
খ) العدل (আদল/ন্যায়বিচার) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“এই তাকদির আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছে। এতে কোনো জুলুম নেই।”
গ) الرحمة (রহমত) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“তাকদিরের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত বিদ্যমান, যদিও তা বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না। অনেক সময় কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর দয়া লুকিয়ে থাকে।”
ঘ) الحكمة (হিকমাহ/প্রজ্ঞা) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“আল্লাহ তাআলার হিকমাহ এই তাকদিরের পেছনে রয়েছে। আল্লাহ কোন কিছু অকারণে করেন না।”
ঙ) الحمد (প্রশংসা) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“যেকোন দিক থেকে তাকালেও আল্লাহর জন্যই পূর্ণ প্রশংসা প্রযোজ্য। তাঁর কুদরত ও কৌশল সর্বোত্তম।”
চ) العبودية (আবুদিয়্যাহ/দাসত্ব) এর দৃষ্টিভঙ্গি:
“মানুষ আল্লাহর দাস। দাসের কোনো অধিকার নেই তার মালিকের সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলার। যেমন শরীআতের বিধান মেনে চলা ফরজ, তেমনই তাকদিরের বিধানও মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে যেমন শরীয়তের মাধ্যমে শাসন করেন, তেমনি তাকদিরের মাধ্যমে শাসন করেন। তাই বান্দার উচিত সব অবস্থায় আল্লাহর বিধানে আত্মসমর্পণ করা।” [আল-ফাওয়াইদ]
৫. তাকদির সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি — Free Will বা মুক্ত ইচ্ছার প্রশ্ন:
আমরা কি সত্যিই স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) রাখি?
- আমরা কি যা খুশি তাই করতে পারি?
- নাকি আল্লাহ আমাদের সব কিছুই নির্ধারণ করে রাখেন?
- তাহলে কি আমরা যা করি তা আমাদের নিজের সিদ্ধান্ত নয়?
এখানে আমাদের দুই ধরনের ইরাদাহ (ইচ্ছা) সম্পর্কে জানা জরুরি—যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল:
ইরাদাহ ক্বাওনিয়াহ ক্বারদিয়্যাহ (إرادة كونية قدرية)
এটি আল্লাহর চূড়ান্ত ইচ্ছা ও তাকদির। এটি এমন ক্বদর যা অপরিবর্তনীয় এবং অবশ্যই ঘটবে।
উদাহরণ: আল্লাহ কোন পাপকাজ পছন্দ করেন না, কিন্তু যদি তিনি চান যে তা কখনও সংঘটিত না হোক, তবে তা কখনও ঘটবেই না।
ইরাদাহ শারইয়্যাহ দ্বীনইয়্যাহ (إرادة شرعية دينية)
এটি হলো আল্লাহর শরঈ ইচ্ছা—আল্লাহ যা ভালোবাসেন এবং আদেশ করেন, এবং যা থেকে নিষেধ করেন।
উদাহরণ: আল্লাহ পাপ করা অপছন্দ করেন, নিষেধ করেন, কিন্তু বান্দারা তবুও তা করতে পারে। এ ধরণের কাজের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু পছন্দ নয়।
সবকিছু লেখা হয়ে গেছে
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ বলেন:
“নবী ﷺ, যিনি সত্যবাদী এবং যাঁর কথা সত্য—তিনি আমাদের বলেন: ‘প্রত্যেক মানুষ সৃষ্টির সূচনায় মায়ের গর্ভে ৪০ দিন নুতফা (বীজ), এরপর আলাকা (রক্তপিণ্ড), তারপর মুদগাহ (মাংসপিণ্ড) অবস্থায় থাকে। এরপর একজন ফেরেশতা প্রেরিত হয় এবং সে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয় এবং চারটি বিষয় লিখে দেয়: তার রিজিক, তার জীবদ্দশা, তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগ্যবান (জান্নাতে যাবে না জাহান্নামে)।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
আরেকটি বর্ণনায়, আলী رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ বলেন:
“আমরা গারকদ কবরস্থানে একটি জানাজার সময় ছিলাম। নবী ﷺ আসলেন, এবং মাটিতে লাঠি দিয়ে আঁচড় দিতে লাগলেন। এরপর বললেন: ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্য জান্নাত বা জাহান্নামে একটি আসন নির্ধারিত হয়ে গেছে এবং সে ভালো না মন্দ লোক—তা লিখে ফেলা হয়েছে।’ কেউ একজন বলল: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে কি আমরা তাকদিরের ওপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দিব না?’
তিনি ﷺ বললেন: ‘প্রত্যেককে তার জন্য যা নির্ধারিত তা অনুযায়ী কাজ সহজ করে দেয়া হয়। কেউ যদি সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তার জন্য ভালো কাজ সহজ করে দেয়া হয়, আর কেউ যদি দুর্ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তার জন্য মন্দ কাজ সহজ করে দেয়া হয়।’ এরপর তিনি সুরা আল-লাইলের আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
﴿فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَٱتَّقَىٰ وَصَدَّقَ بِٱلْحُسْنَىٰ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْيُسْرَىٰ، وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسْتَغْنَىٰ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْعُسْرَىٰ﴾
অর্থ: “অতএব যে ব্যক্তি (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) দান করে ও (আল্লাহকে) ভয় করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমরা তার জন্য সহজ পথে চলা সহজ করে দিব। আর যে কৃপণতা করে ও নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে, আমরা তার জন্য কষ্টকর পথ সহজ করে দিব।” [সহিহ বুখারি]
কিছু ভুল বোঝাবুঝি: তাকদির কি আমাদের কাজের কারণ?
অনেকেই মনে করেন: “যেহেতু আল্লাহ আমাদের সবকিছু লিখে রেখেছেন, তাই আমরা যেটাই করি, সেটা আল্লাহর লেখা অনুযায়ী হচ্ছে। কাজেই আমরা দায়ী নই।” এটাই একটি ভুল ধারণা।
সঠিকটা হচ্ছে: আমরা যা করি, তা আমাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও চয়নের মাধ্যমেই করি। আল্লাহ তা’আলা শুধু জানেন আমরা কী বেছে নেব এবং তা-ই তিনি লাওহে মাহফূজে লিখেছেন। এটি জ্ঞানভিত্তিক লিপিবদ্ধকরণ, কারণ হিসেবে নয়। সহজ ভাষায় বললে, আমাদের কাজ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কারণ আল্লাহ জানেন আমরা কী করব। কাজের কারণ তাকদির নয়, বরং তাকদির আমাদের কাজের পূর্বজ্ঞান।
আল্লাহ কেন এমন কিছু ঘটতে দেন যা তিনি অপছন্দ করেন?
আল্লাহ যেসব কাজ অপছন্দ করেন, সেগুলোর কিছু তিনি তাঁর হিকমাহ ও চূড়ান্ত জ্ঞানের কারণে ঘটতে দেন—কারণ এগুলোর মাধ্যমে বড় কোনো কল্যাণ বা শিক্ষা আসে।
মূল বিষয়সমূহ:
১) আমাদের আমল আল্লাহকে উপকার বা অপকার করে না। আমরা ভালো কাজ করি বা পাপ করি, তা আল্লাহর কোনো লাভ বা ক্ষতি করে না। এসব কেবল আমাদের নিজেদের কল্যাণ বা ক্ষতির জন্য।
২) আল্লাহ কখনো ভালো কাজ থেকেও আমাদের বাধা দেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় কল্যাণের দরজা খুলে যায়।
৩) কিছু কাজ যেমন: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, উত্তম চরিত্র ইত্যাদি inherently ভালো, তাই আল্লাহ তা ভালোবাসেন, চান ও সৃষ্টি করেন।
৪) আবার কিছু কাজ আছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবুও সেগুলো ঘটতে দেন, কারণ এর পেছনে আছে পরোক্ষ উপকারিতা ও হিকমাহ।
উদাহরণ: উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা কিছু নির্দেশ অমান্য করায় সাময়িক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। যদিও আল্লাহ চান মুমিনরা বিজয়ী হোক, তবুও এই শিক্ষা ১৪০০ বছর পরেও উম্মাহ গ্রহণ করছে—এটাই আল্লাহর হিকমাহ।
ক্বদরের ভুল ব্যাখ্যা
ক্বদরের (আল্লাহর নির্ধারণ) বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি সাহাবাদের যুগ থেকেই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
কদরের বিষয়ে মানুষের বিশ্বাস তিন প্রকার:
(ক) জাবরিয়াহ: মনে করে মানুষ কোনোকিছু করতে পারে না—সব কিছু আল্লাহ জোর করে করান। এটা আল্লাহর ন্যায়বিচারের বিরোধী।
(খ) কাদারিয়াহ: মনে করে মানুষ নিজেই তার কাজ তৈরি করে, আর আল্লাহ জানেন না যতক্ষণ না তা ঘটে। এটা আল্লাহর জ্ঞান ও কুদরতের অস্বীকার।
(গ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: সঠিক বিশ্বাস—মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, কিন্তু কিছুই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঘটে না।
আমরা সবাই স্বাভাবিকভাবে জানি—আমরা নিজের ইচ্ছায় ক্লাসে আসি বা কাজ করি। কিন্তু কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমাদের হাতের বাইরে (যেমন কোথায় জন্মাবো)—এটাই ক্বদর।
মানুষের ইচ্ছা বনাম আল্লাহর ইচ্ছা
আল্লাহ বলেন:
“তোমাদের মধ্যে যে সোজা পথে চলতে চায়।” [আত-তাকওয়ীর: ২৮] – এই আয়াতে মানুষের ইচ্ছার কথা স্পষ্ট।
“তোমরা চাইবে না যতক্ষণ না আল্লাহ, জগতসমূহের পালনকর্তা, চান।” [আত-তাকওয়ীর: ২৯] – এখানে আল্লাহর ইচ্ছা স্পষ্ট।
এটা বোঝার জন্য আল্লাহর ইচ্ছাকে অনুমতির মতো ভাবুন। মানুষ নিজে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয় আল্লাহর অনুমতিতে। সুতরাং ভালো-মন্দ যা-ই হোক, তা ঘটে আল্লাহর হিকমাহ ও জ্ঞানের অধীনে।
কাফিরদের ব্যাপারে কী বলা যায়?
আল্লাহ কাফিরদের সৃষ্টি করেননি। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কেউ জাহান্নামে গেলে সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও কর্মফল। আল্লাহ চান না কেউ জাহান্নামে যাক।
তাই আল্লাহ মানুষকে কেবল আকলের উপর নির্ভর করতে দেননি—বরং: ১ লক্ষ ২৪ হাজারের বেশি রাসূল ও আরও বেশি নবী পাঠিয়েছেন। যেন তারা আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন ও সঠিক পথ দেখান। লাওহে মাহফূজে যা লেখা, তা হচ্ছে আল্লাহর পূর্বজ্ঞান—তিনি জানেন আমরা কী বেছে নেব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস:
عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال:
كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ: «مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে যাবে, শুধু তারা ব্যতিত যারা অস্বীকার করে।”
জিজ্ঞেস করা হলো, “কে অস্বীকার করবে?”
তিনি ﷺ বললেন, “যে আমার আনুগত্য করে সে জান্নাতে যাবে, আর যে আমার নাফরমানী করল সেই অস্বীকার করল।” [বুখারি]
আল্লাহ বলেন,
سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ لَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشْرَكْنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَىْءٍۢ ۚ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّىٰ ذَاقُوا۟ بَأْسَنَا ۗ قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍۢ فَتُخْرِجُوهُ لَنَآ ۖ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
“যারা শিরক করেছে তারা বলবে, ‘আল্লাহ চাইলে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষেরা কখনোই শিরক করতাম না, এবং কোনো কিছু হারামও করতাম না।’ তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও এমনই মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরেছিল, অবশেষে তারা আমাদের শাস্তি আস্বাদন করেছিল। বল, ‘তোমাদের কাছে কোনো জ্ঞান আছে কি, তা আমাদের সামনে আনো? তোমরা তো কেবল অনুমানই করো এবং নিছকই মিথ্যাচার করছো।” [সূরা আল-আন‘আম, ১৪৮]
আল্লাহ বলেন,
فَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يَهْدِيَهُۥ يَشْرَحْ صَدْرَهُۥ لِلْإِسْلَـٰمِ ۖ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُۥ يَجْعَلْ صَدْرَهُۥ ضَيِّقًا حَرَجًۭا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِى ٱلسَّمَآءِ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْعَلُ ٱللَّهُ ٱلرِّجْسَ عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
“আল্লাহ যাকে হিদায়াত দিতে চান, তাঁর বক্ষ ইসলাম গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহ করতে চান, তাঁর বক্ষকে এমন সংকুচিত করে দেন যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। এভাবেই আল্লাহ ঈমান না আনা লোকদের উপর অশুদ্ধতা চাপিয়ে দেন।” [সূরা আল-আন‘আম, ১২৫]
ইবন আব্বাস رَضِيَ ٱللَّهُ عَنْهُ বলেন, “এর অর্থ হল, আল্লাহ কারো অন্তরকে তাওহীদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য খুলে দেন এবং তাতে বিশ্বাস জন্ম দেন।” [তাফসীর ইবন কাসীর]
অন্যদিকে, যাকে তিনি বিভ্রান্ত করতে চান, তাঁর অন্তরকে আল্লাহ নিজেরই পরিচয় ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেন। “এটা হচ্ছে একটি ন্যায়সঙ্গত শাস্তি তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে তাঁর যথার্থ মর্যাদা দেয় না এবং তাঁর নিয়ামত অস্বীকার করে। তাই আল্লাহ তাদের জন্য হিদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন।”
ইমাম ইবনেল কাইয়্যিম رَحِمَهُ ٱللَّهُ বলেন, “হিদায়াত হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহ, যা তিনি সেই ব্যক্তির অন্তরে স্থায়ী করেন যে এটার যোগ্য এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদাত করে। যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘যে হিদায়াতের যোগ্য নয়, তার দোষ কী?’ উত্তর হলো—তার সবচেয়ে বড় দোষ হলো সে নিজেই এ যোগ্যতা অর্জন করতে চায়নি। সে আল্লাহর অসন্তুষ্টিকর পথ বেছে নিয়েছে এবং নিজের খেয়ালখুশিকে অনুসরণ করেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পরিবর্তে। এর চেয়ে বড় পাপ আর কী হতে পারে?”
[شفاء العليل في مسائل القضاء والقدر والحكمة والتعليل]
প্রত্যেকেরই ইচ্ছা ও স্বাধীনতা রয়েছে। আমরা পুতুল নই যাদের নিজের কোনো ইচ্ছা নেই। তাহলে কীভাবে বুঝব মানুষের ইচ্ছা ও আল্লাহর ইচ্ছার পার্থক্য? উদাহরণস্বরূপ: যায়েদ একজন স্বাধীন ব্যক্তি যার নিজস্ব ইচ্ছা রয়েছে। তাঁর কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব এবং রাসূল এসে পৌঁছেছে। তিনি জানেন, কিছু কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে শরিয়তসম্মতভাবে ফরজ করা হয়েছে। এ জ্ঞান থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—আনুগত্য করবেন, নাকি বিদ্রোহ করবেন। এখানে সিদ্ধান্তটি যায়েদের।
আল্লাহর পক্ষ থেকে কী হয়?
আল্লাহ আগে থেকেই জানেন যায়েদ কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা লাওহে মাহফূজে লেখা হয়েছে, আল্লাহ তা ইচ্ছা করেছেন এবং যায়েদের সেই কাজটিই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাজকর্ম তার স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে হয়। তার ইচ্ছা আছে এবং সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার শক্তিও আছে। যদি মানুষের কোনো ইচ্ছা না থাকত, তাহলে গোনাহের কারণে শাস্তি দেওয়া অন্যায় হতো। একইভাবে, আনুগত্যও অর্থহীন হতো। সুতরাং, মানুষের কাছে ইচ্ছা রয়েছে, কিন্তু তার কাজকর্ম আল্লাহর ইলম ও তাকদিরের আলোকে নির্ধারিত। তবে আল্লাহ তাকে বাধ্য করেন না। যদি বাধ্য করতেন, তাহলে মানুষের ইচ্ছা বা কর্মক্ষমতা থাকত না। অথচ এটি আল্লাহর সুন্নাহর পরিপন্থী এবং সম্পূর্ণ অন্যায়।
আমাদের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি নির্ধারণকারী বিষয়। তাহলে আমরা কীভাবে বুঝব যে আল্লাহ্ সবকিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন, আর আমাদের কর্মও আমরা করে থাকি? নিচের উদাহরণটি আদর্শ নয় (কারণ আল্লাহর সাথে কোনো কিছুর তুলনা হয় না), তবুও বোঝার জন্য বলা যায়—একজন গাড়ি নির্মাতা একটি গাড়ি তৈরি করল যার সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে: গতি বাড়ানো, কমানো, ডান-বাম মোড় নেওয়া, ইউ-টার্ন দেওয়া, পেছনে চলা ইত্যাদি। এখন কেউ যখন ওই গাড়িটি চালায়, তখন আমরা বলি—এগিয়ে বা পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে নির্মাতার পক্ষ থেকে তৈরি, কিন্তু কখন চলবে বা থামবে তা নির্ধারণ করে চালক, নির্মাতা নয়।
তদ্রূপ, আমাদের সব ‘সক্ষমতা’ আল্লাহ দিয়েছেন, কিন্তু কাজগুলো আমরা করি। এটাই বোঝায়—আল্লাহ আমাদের কর্ম সৃষ্টি করেছেন, যার মানে হলো এতে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“তুমি আল্লাহকে হেফাজত করলে, তিনি তোমাকে হেফাজত করবেন। তুমি তাঁকে সামনে রাখলে, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন চাও, আল্লাহর নিকট চাও; যখন সাহায্য চাও, আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও। জেনে রাখো, যদি সমগ্র সৃষ্টি যদি তোমাকে উপকার করতে চায়, তারা কিছুতেই উপকার করতে পারবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা নির্ধারণ করেন। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা কিছুতেই তা পারবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা নির্ধারণ করেন। কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।” [তিরমিজি]
এই হাদীসে লক্ষ্য করুন: রাসূল ﷺ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে তাকদির ইতোমধ্যেই নির্ধারিত। কিন্তু তারপরও তিনি আমাদেরকে কাজ করতে বলেছেন—আল্লাহকে হেফাজত করতে বলেছেন, তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চাইতে বলেছেন।
আরেক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন: “যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের রিজিক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।” [তিরমিজি]
উমর رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ বলেন: “তোমাদের কেউ যেন রিজিক পাওয়ার জন্য কাজ না করে শুধু দু’আ করে বসে না থাকে—জেনে রেখো, আকাশ থেকে সোনা বা রুপার বৃষ্টি হয় না।” [ইয়াহহিয়া উলুমিদ্দিন]
ইবনে তাইমিয়াহ رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন: “তাকদিরের পূর্বে বান্দার একটি অবস্থা থাকে, আর তার পরবর্তীতেও। পূর্বে বান্দার দায়িত্ব হলো—আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁর কাছে দু’আ করা। আর যদি তাকদির এমন কিছু হয় যা তার নিজের কাজ নয়, তাহলে ধৈর্য ও সন্তুষ্টি অবলম্বন করতে হবে। যদি তা তার কাজের ফসল হয় এবং তা ভালো হয়, তাহলে আল্লাহর প্রশংসা করবে। আর যদি তা গুনাহর ফল হয়, তাহলে ক্ষমা চাইবে।” [মাজমু’ আল-ফাতাওয়া]
তাকদির বাস্তবায়নের পূর্বে আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, দুআ করা, তাঁর উপর নির্ভর করা এবং কাঙ্ক্ষিত ভালো ফল পেতে পরিশ্রম করা। তাকদির বাস্তবায়িত হলে আমাদের উচিত তা মেনে নেওয়া ও সামনে এগিয়ে যাওয়া।
– যদি তা আমাদের কর্ম না হয়, যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়—তাহলে তা পরীক্ষার অংশ ধরে নিয়ে ধৈর্য ধারণ করব।
– যদি তা নিয়ামত হয়, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব।
– যদি তা আমাদের ভালো কাজে ফসল হয়, তাহলে আল্লাহর প্রশংসা করব।
– আর যদি তা গুনাহর ফল হয়, তাহলে তাওবা করব ও সংশোধন করব।
সর্বশেষে, আমাদের হাতে একটি চূড়ান্ত পছন্দ রয়েছে—আমরা আল্লাহর ইবাদত করব ও ভালো কাজ করব, নাকি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনগুলো উপেক্ষা করব।
রাসূল ﷺ বলেন: “জাহান্নামে প্রবেশকারীকে জানানো হবে—তুমি যদি ভালো কাজ করতে, তাহলে জান্নাতে এই জায়গাটি পেতে—যাতে সে দুঃখ পায়। আর জান্নাতে প্রবেশকারীকে দেখানো হবে—তুমি যদি মন্দ কাজ করতে, তাহলে জাহান্নামে এই জায়গা পেতে—যাতে সে শুকরিয়া আদায় করে।” [বুখারি]
আমাদের প্রত্যেকের জন্য জান্নাতেও একটি জায়গা এবং জাহান্নামেও একটি জায়গা নির্ধারিত আছে। আমরা যেখানে থাকব, সেখানে পৌঁছে আমাদের দেখানো হবে—যদি তুমি অন্য পথ বেছে নিতে, তাহলে কী হতে পারত। এতে আমাদের শুকরিয়া বা দুঃখ প্রকাশ হবে। একটু ভাবুন—আপনি একটি বিমান থেকে প্যারাসুটসহ লাফ দিলেন। দুইটি নির্ধারিত পরিণতি অপেক্ষা করছে—আপনি প্যারাসুট খুলে বাঁচবেন, অথবা তা না খুলে মৃত্যুবরণ করবেন। উভয়টিই তাকদিরভুক্ত। কিন্তু সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি কোনটি বেছে নেবেন?
সুতরাং, আমরা আল্লাহর ক্বদর ও তাকদিরকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না যেন তাঁর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকতে পারি। বরং, আমরা বিশ্বাস করি এবং জানি—আল্লাহ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন কিতাব নাযিল করে ও রাসূল পাঠিয়ে। অতএব, আমাদের কাজ হলো জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা।
আল্লাহ বলেন:
﴿رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌۭ بَعْدَ الرُّسُلِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا﴾
“সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে রাসূলগণের পরে মানুষের আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।” [সূরা আন্-নিসা, ১৬৫]
আল্লাহ আরও বলেন:
﴿ٱلْيَوْمَ تُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا كَسَبَتْۚ لَا ظُلْمَ ٱلْيَوْمَۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَرِيعُ ٱلْحِسَابِ﴾
“আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জন (কর্মফল) অনুযায়ী প্রতিফল দেওয়া হবে। আজ কোনো জুলুম হবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অতি দ্রুত।” [সূরা গাফির, ১৭]
এই আয়াত ইঙ্গিত করে যে প্রত্যেক বান্দার কিছু কাজ রয়েছে যা সে উপার্জন করে, আর সে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। এই সবকিছুই আল-ক্বদা ও আল-ক্বদর (আল্লাহর ফয়সালা ও পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত) অনুসারে ঘটে।
আল্লাহর ইনসাফ ও মানুষের সামর্থ্য
আল্লাহর সুন্নাহর পরিপন্থী এবং অসম্ভব যে তিনি আমাদের এমন কিছু দায়িত্ব দিবেন, যা তিনি আমাদের শেখাননি বা যা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। কোনো কিছু না জানিয়ে কিংবা যেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তার জন্য শাস্তি দেওয়া অন্যায়—আর আল্লাহ তো সব থেকে ন্যায়পরায়ণ।
আল্লাহ বলেন:
﴿رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌۭ بَعْدَ الرُّسُلِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا﴾
“সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে রাসূলগণের পরে মানুষের আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।” [সূরা আন্-নিসা, ১৬৫]
তাই রাসূলদের প্রেরণ করা হয়েছে তাকদিরেরই অংশ হিসেবে। আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর শাস্তি অন্যায় নয়, বরং ন্যায্য। কারণ তিনি পূর্বেই হিদায়াত দিয়েছেন, ভালো ও মন্দ পথের দিশা বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং অজুহাত তুলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا﴾ “আল্লাহ কোনো প্রাণকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা আল-বাকারা, ২৮৬]
﴿وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ﴾ “(আল্লাহ) তোমাদের উপর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো কষ্টার্জক বিষয় আরোপ করেননি।” [সূরা আল-হাজ্জ, ৭৮]
﴿فَاتَّقُوا۟ ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُمْ﴾ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী।” [সূরা আত-তাগাবুন, ১৬]
রাসূল ﷺ বলেন:
“আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা তারা জোরপূর্বক করতে বাধ্য হয়—তা মাফ করে দিয়েছেন।” [ইবনে মাজাহ]
আমল ও দায়বদ্ধতা: ক্বদরের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়
আল্লাহ তাঁর আদেশ বান্দার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, এবং এমন কিছু আদেশ করেননি যা মানুষের সাধ্যের বাইরে।
আল্লাহ এমন কিছু আদেশ দেননি যা পালন অসম্ভব, এবং এমন কিছু নিষেধ করেননি যা বর্জন করা সম্ভব নয়।
তিনি কাউকে গুনাহ করতে বাধ্য করেননি, বরং সবাইকেই ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।
সত্যি বলতে, একজন মানুষ দুনিয়াবি লাভের জন্য সর্বদা সুযোগ খোঁজে। কেউ কি কখনো বলে—“আমি ব্যবসা করিনি বা পড়ালেখা করিনি, কারণ ক্বদর আমাকে বাধা দিয়েছে”? বরং সে এর জন্য চেষ্টা করে। তাহলে কেন কেউ দ্বীনের ফায়দা ছেড়ে দিবে ক্বদরের অজুহাতে? আপনি যদি আক্রমণের শিকার হন, আপনি কি শুধু বসে থাকবেন কারণ এটা পূর্বনির্ধারিত? না কি আপনি আত্মরক্ষা করবেন?
একজন যদি তার প্রতি হওয়া জুলুমকে ক্বদর মনে না করে বিচার চাইতে পারে, তাহলে সে কেমন করে নিজে আল্লাহর হক ত্যাগ করে ক্বদরের অজুহাত দেয়? তাই ক্বদরের প্রতি ঈমান কখনোই গুনাহের বৈধ অজুহাত হতে পারে না।
ক্বদর ও ইচ্ছার ব্যবহারিক উপলব্ধি
একজন চোরকে উমর ইবন আল-খাত্তাব رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ এর সামনে আনা হয়। তিনি চোরের হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন চোর বলল, “হে মু’মিনদের আমীর, আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্বদরের অধীনে চুরি করেছি।”
চোরের এই কথা সত্য ছিল, কিন্তু তার সামনে ছিলেন উমর ইবন আল-খাত্তাব, যিনি বললেন, “আমরা তোমার হাত কাটছি আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্বদরের মাধ্যমেই।” অতঃপর তিনি আল্লাহর ক্বদরের অধীনেই শাস্তির আদেশ দিলেন।
সুতরাং উমর رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ তার বিরুদ্ধে একই যুক্তি ব্যবহার করলেন, যেটি সে নিজের পক্ষের প্রমাণ হিসেবে এনেছিল। উভয় ঘটনা-ই আল্লাহর জ্ঞানে পূর্ব থেকেই লিখিত ছিল। [মিনহাজ আস-সুন্নাহ]
আরেকটি ঘটনায়, উমর رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে জানা যায় যে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তখন তিনি ঘোষণা দেন যে তাঁরা মদিনায় ফিরে যাবেন। এ কথা শুনে আবু উবাইদাহ ইবন আল-জাররাহ (রহি.) বললেন, “আপনি কি আল্লাহর ক্বদর থেকে পালাচ্ছেন?”
উমর (রহি.) বললেন, “হে আবু উবাইদাহ! এটা যদি অন্য কেউ বলত… হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর ক্বদর থেকে আল্লাহর ক্বদরের দিকেই পালাচ্ছি। তুমি কি দেখ না, যদি তোমার উট দুটি ক্ষেতবিশিষ্ট উপত্যকায় নামানো হয়—একটি উর্বর এবং অপরটি অনুর্বর—তাহলে তুমি আল্লাহর ক্বদরের অধীনেই উর্বর স্থানে চারণ করবে নাকি অনুর্বর স্থানে চারণ করবে?” [বুখারি]
সাহীহাইন-এ প্রমাণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“আদম ও মূসা عليه السلام মধ্যে একবার বিতর্ক হয়েছিল। মূসা عليه السلام বললেন, ‘আপনি তো আদম, যাকে আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে নিজের রূহ ফুঁকেছেন, যাকে ফেরেশতাগণ সিজদা করেছে, এবং যাকে আল্লাহ সব কিছুর নাম শিখিয়েছেন। তাহলে আপনি কেন আমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিলেন?’
আদম عليه السلام বললেন, ‘আপনি তো মূসা, যাকে আল্লাহ তাঁর বাণী ও বার্তার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। আপনি কি পাননি যে এটি আমার সৃষ্টি হওয়ার আগেই নির্ধারিত ছিল?’
মূসা (আঃ) বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ তখন রাসূল ﷺ বললেন, “অতঃপর আদম মূসার বিরুদ্ধে যুক্তিতে জয়লাভ করলেন।”
এখানে, আদম (আঃ) আল্লাহর দরবারে সত্যিকার অর্থে তাওবা করেছিলেন এবং আল্লাহ তা কবুলও করেছিলেন। তিনি জানতেন যে তাঁর তাওবা কবুল হয়েছে, এবং তিনি নিজের গোনাহর বৈধতা প্রমাণ করছিলেন না।
বরং, মূসা (আঃ) আদম (আঃ)-কে দোষারোপ করছিলেন এমন কিছুর কারণে যা ঐ গোনাহের ফলাফল হিসেবে হয়েছিল। আদম (আঃ) সঠিকভাবে মূসা (আঃ)-কে স্মরণ করিয়ে দেন যে—দুর্যোগসমূহ আল্লাহর ক্বদরের অধীনে ঘটে, সুতরাং সেগুলোকে মেনে নেওয়া উচিত এবং তাতে আপত্তি করা উচিত নয়।
আল-ক্বদর: একটি জ্ঞানের বিষয়
আল-ক্বদর হল আল্লাহর জ্ঞানের একটি বিষয়। কেউ জানে না তার ক্বদর কী, যতক্ষণ না তা ঘটে। কোনো কাজ করার ইচ্ছা আগে আসে, তারপর আসে কাজ। কেউ জানে না ক্বদর তাকে কী নিয়ে আসছে। তাই ক্বদরকে পাপের অজুহাত বানানো, বা আল্লাহর নির্দেশনা উপেক্ষার জন্য ব্যবহার করা, সম্পূর্ণ ভুল।
শাইখ ইব্রাহিম নূহ حَفِظَهُ ٱللَّٰهُ বলেন: “মানুষ কখনই জানে না যে আল্লাহর ক্বদর কী, যতক্ষণ না সেটি ঘটে। ক্বদর কী তা বোঝার চেষ্টায় সময় নষ্ট করা বোকামি, কারণ তা ঘটার আগ পর্যন্ত কেউ জানবে না। ক্বদরকে নিজের কাজের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করাও ভুল। যদি এটি বৈধ হত, তবে প্রতিটি গোনাহগার এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করত। ক্বদর শুধুমাত্র তখনই ব্যাখ্যার অংশ হতে পারে, যখন কেউ অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো গোনাহের জন্য তাওবা করে ফেলেছে। যখন কেউ আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন ঐ গোনাহ সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয়। কেউ যদি পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে অতীতের গোনাহকে নিয়ে উপহাস করার, অপমান করার বা তাকে দোষারোপ করার কোনো অধিকার অন্য কারো থাকে না।”
সুতরাং, “এটি ছিল ক্বদর” – এই কথাটি ব্যবহার করা কেবলমাত্র তখনই সঠিক যখন কেউ কোন গোনাহ থেকে পূর্ণ তাওবা করেছে, এবং কেউ তাকে সেই অতীত নিয়ে অপমান করার চেষ্টা করছে।
উদাহরণ:
ধরুন, কেউ কয়েক বছর আগে কোনো গোনাহ করেছিল, কিন্তু এখন সে আল্লাহর কাছে তাওবা করে ফেলেছে এবং সংশোধন করে নিয়েছে। এখন কেউ যদি এসে বলে, “তুমি তো একজন গোনাহগার ছিলে”— তখন সে বলতে পারে: “হ্যাঁ, এটা ছিল আমার ক্বদর।”
এই অনুধাবন আমাদের শেখায়:
- ক্বদর আমাদেরকে পাপ করার অজুহাত দেয় না।
- কিন্তু ক্বদর আমাদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে শেখায়, অতীতকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে সাহায্য করে।
- একমাত্র সেই সময় ক্বদরের উল্লেখ করা যায়, যখন পাপ থেকে তাওবা করা হয়ে গেছে এবং কোনো ব্যক্তি অতীতকে সামনে এনে অপমান করতে চায়।
ক্বদর নিয়ে এটি আমাদের ধারাবাহিক দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্বের লিংক: প্রথম পর্ব। চলবে…








No Comment! Be the first one.