আল্লাহ কি অশুভ ও বিপর্যয় নির্ধারণ করেছেন?
- আল্লাহ কি অশুভ চেয়েছেন?
- আল্লাহ কেন অশুভ ঘটতে দিলেন?
- যদি মানুষের গুনাহ ক্বদরের অধীনে লিখিত থাকে, তাহলে আল্লাহ কেন তাদের শাস্তি দেবেন?
এই প্রশ্নগুলোতে প্রবেশ করার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—এই বিভ্রান্তি, অনেকেই যেটিতে পড়ে, তা মূলত আল্লাহর কাজ বা হিকমাহ (দিব্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা) সম্পর্কে যথাযথ অনুধাবনের অভাবে সৃষ্টি হয়। এজন্য এই প্রশ্নগুলোর কারণে আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করা একেবারেই অযৌক্তিক। আল্লাহর অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং আল্লাহর কাজের হিকমাহ বোঝা—এই দুটি ভিন্ন বিষয়। এই পয়েন্টটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি নাস্তিক, সংশয়বাদী ও এক্স-মুসলিমদের একটি সাধারণ যুক্তি হয়ে উঠেছে।
অশুভ (Evil) বলতে কী বোঝায়?
অশুভকে ভালো জিনিসের অনুপস্থিতি হিসেবেও বর্ণনা করা যায়। আমরা অশুভ এবং ভালোকে একটি প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি:
- ভালো: যা মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যা আনন্দ ও সন্তুষ্টি আনে।
- অশুভ: যা মানুষের প্রকৃতির পরিপন্থী এবং যা ক্ষতি ও অস্বস্তি সৃষ্টি করে।
“অশুভ” সাধারণত দুটি ভাগে বোঝানো হয়:
১) নৈতিক অশুভ (Moral evil):
এটি হলো নৈতিক সত্তার (মানুষের) ইচ্ছাশক্তির অপব্যবহার। সহজ ভাষায়, এটি সেই অশুভ যা মানুষ নিজ হাতে করে—অপরাধ, জুলুম, অন্যায় ইত্যাদি।
২) প্রাকৃতিক অশুভ (Natural evil):
এটি এমন বিপর্যয় যা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ও নিয়ম দ্বারা সংঘটিত হয়—যেমন ভূমিকম্প, বন্যা, মহামারি ইত্যাদি।
আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা
এটা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করা আবশ্যক যে—আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা, তিনি ভালো এবং খারাপ—উভয়ই সৃষ্টি করেছেন, কারণ আল্লাহ যা চান, তা-ই করেন। আল্লাহ যা করেন, তা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা যায় না।
ٱللَّهُ خَلِقُ كُلِّ شَىْءٍۢ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ وَكِيلٌۭ
“আল্লাহ সকল কিছুর স্রষ্টা, এবং তিনিই সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” [সূরা আয-যুমার, ৬২]
সঠিক আদব: কিভাবে আল্লাহর প্রতি কথা বলব?
আল্লাহর প্রতি সুন্দর আদব হচ্ছে এই যে, আমরা বলি না যে আল্লাহ গোনাহ বা অপরাধ সৃষ্টি করেছেন। বরং আমরা বলি:
আল্লাহ এমন সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন যাদের মধ্যে ইচ্ছাশক্তি ও সামর্থ্য দিয়েছেন, যারা খারাপ কাজ করতে পারে।
তাওহীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই কথাগুলোর চমৎকার ব্যাখ্যা আসে ইব্রাহীম عليه السلام এর দোয়া থেকে:
ٱلَّذِى خَلَقَنِى فَهُوَ يَهْدِينِ
“তিনি (সেই সত্তা) যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তিনিই আমাকে পথনির্দেশ দেন।”
وَٱلَّذِى هُوَ يُطْعِمُنِى وَيَسْقِينِ
“তিনিই আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।”
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
“আমি অসুস্থ হলে, তিনিই আমাকে আরোগ্য দেন।”
وَٱلَّذِى يُمِيتُنِى ثُمَّ يُحْيِينِ
“তিনিই আমাকে মৃত্যুবরণ করাবেন এবং পরে পুনরুজ্জীবিত করবেন।”
[সূরা আশ-শু’আরা, ৭৮-৮১]
নবী ইবরাহীম عليه السلام -এর আদব থেকে শিখুন। তিনি সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনার কৃতিত্ব আল্লাহর প্রতি প্রদান করেছেন। যদিও আল্লাহ অসুস্থতা সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা হিসেবে, নবী ইবরাহীম عليه السلام আদবের কারণে তা সরাসরি আল্লাহর প্রতি সম্বন্ধ করেননি—তিনি বলেননি যে আল্লাহই তাঁকে অসুস্থ করেন। বরং তিনি সৌজন্য ও আদবের সাথে এ দিকটি আল্লাহর প্রতি সম্বন্ধ করেননি।
আল্লাহ বলেন:
أَيْنَمَا تَكُونُوا۟ يُدْرِككُّمُ ٱلْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِى بُرُوجٍۢ مُّشَيَّدَةٍۢ ۗ وَإِن تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌۭ يَقُولُوا۟ هَذِهِۦ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ ۖ وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌۭ يَقُولُوا۟ هَذِهِۦ مِنْ عِندِكَ ۚ قُلْ كُلٌّۭ مِّنْ عِندِ ٱللَّهِ ۖ فَمَالِ هَٓؤُلَآءِ ٱلْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًۭا
مَّآ أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍۢ فَمِنَ ٱللَّهِ ۖ وَمَآ أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍۢ فَمِن نَّفْسِكَ ۚ وَأَرْسَلْنَكَ لِلنَّاسِ رَسُولًۭا ۚ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ شَهِيدًۭا
“তোমরা যেখানে থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের ধরে ফেলবেই, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে থাক। আর যদি তাদের কোনো কল্যাণ পৌঁছে, তারা বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’; আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ পৌঁছে, তারা বলে, ‘এটি তোমার পক্ষ থেকে।’ বলো, ‘সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ তাহলে এরা কেমন জাতি, যারা কোনো কথা বুঝতে চায় না?
তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে; আর তোমার কাছে যে অকল্যাণ পৌঁছে, তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে। আমি তোমাকে মানবজাতির প্রতি রাসূল করে পাঠিয়েছি, আর আল্লাহ সাক্ষ্যদানে যথেষ্ট।” [সূরা আন-নিসা: ৭৮-৭৯]
মানুষের উপর যে সব বিপদ আসে বা কোনো মন্দ জিনিস আঘাত হানে, তা কেবল আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষেই ঘটে। আল্লাহ বলেন:
مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُۥ ۚ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ
“কোনো বিপদ আসে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সব কিছুর জ্ঞান রাখেন।” [সূরা আত-তাগাবুন: ১১]
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ যা করেন তার সবকিছুর পেছনে একটি মহান হিকমাহ (প্রজ্ঞা) রয়েছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হোক বা না হোক। আমাদের কাছে তো সম্পূর্ণ চিত্র নেই, বরং সামান্য একটি পিক্সেলও নেই; কিন্তু আল্লাহর কাছে রয়েছে পূর্ণ চিত্র এবং তার চেয়েও বেশি। আল্লাহ বলেন:
وَمَا خَلَقْنَا ٱلسَّمَوَتِ وَٱلْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَعِبِينَ مَا خَلَقْنَهُمَآ إِلَّا بِٱلْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
“আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এদের মাঝে যা কিছু আছে তা ক্রীড়া করে সৃষ্টি করিনি। আমি এগুলো যথার্থতার (উদ্দ্যেশ্যের) সঙ্গে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” [সূরা আদ-দুখান: ৩৮-৩৯]
আল্লাহ অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। কাজেই অন্যায় বা মন্দ বলতে বোঝায়—কোনো কিছুকে তার প্রকৃত স্থান ব্যতীত অন্যত্র স্থাপন করা। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহ পবিত্র ও পরিপূর্ণ। তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, তাঁর প্রতি কোনো প্রকার মন্দ, অন্যায়, বা জুলুমের সম্বন্ধ আরোপ করা যায় না।
যদি আল্লাহ আমাদের কোনো পরিমাপ বা উদ্দেশ্য ছাড়া, বা ভালো-মন্দের পরিকল্পনা ছাড়াই সৃষ্টি করতেন, তবে তিনি ইবাদতের যোগ্য কোনো উপাস্য হতেন না। আল্লাহ ভুল করেন না, ভুলে যান না, কিছু উপেক্ষা করেন না, এবং কখনো কারো প্রতি জুলুম করেন না। তিনি এসব ত্রুটি থেকে পবিত্র।
“The Problem of Evil”
জর্জ বুকনার (George Büchner), একজন জার্মান নাস্তিক ও কবি, মন্দের সমস্যাকে “ নাস্তিকতার অনড় খুঁটি ” বলেছেন। আপনি কি “এপিকিউরাসের দ্বিধা” (Epicurus’ Dilemma) সম্পর্কে শুনেছেন? মন্দের অস্তিত্ব একটি প্রাচীন যুক্তি, যা দর্শনগতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন এপিকিউরাস (মৃত্যু: ২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। তার যুক্তি ছিল এরূপ:
- যদি আল্লাহ মন্দ প্রতিরোধ করতে চান এবং তিনি তা করতে সক্ষম হন, তবে কেন মন্দ আছে?
- যদি তিনি মন্দ প্রতিরোধ করতে চান, কিন্তু সক্ষম না হন, তবে তিনি সর্বশক্তিমান নন।
- যদি তিনি মন্দ প্রতিরোধ করতে না চান, অথচ তা করতে সক্ষম হন, তবে তিনি অশুভ ও অমঙ্গলকামী।
- যদি তিনি না চান এবং না পারেন, তবে কেন তাকে ‘ঈশ্বর’ বলা হবে?
এই ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কোনো ঈশ্বর নেই!
এটা তখনই ঘটে যখন কেউ কোনো বিষয়কে অতিসরলীকরণ করে এবং মনে করে সব কিছু সাদা-কালো। শুধু এই কারণে যে মন্দ বিদ্যমান এবং আল্লাহ তা ঘটতে দেন, এর মানে এই নয় যে আল্লাহ অজ্ঞান, উদাসীন, কিংবা অক্ষম।
এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো:
প্রথমত: এই অনুমান যে, একটি সর্বশক্তিমান সত্তা সব রকম ও সব মাত্রার মন্দকে সবসময় প্রতিরোধ করবেই। কিন্তু বাস্তবে একজন ব্যক্তি বৃহত্তর কল্যাণ বা কোনো প্রজ্ঞার জন্য কোনো সীমিত মন্দকে অনুমোদন দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত: “কেন” প্রশ্নটি করা মানে এই ধারণা করা যে এর একটি ব্যাখ্যা থাকা উচিত বা আমরা সেই ব্যাখ্যার অধিকারী।
তৃতীয়ত: যে জিনিসকে কেউ মন্দ হিসেবে দেখছে, সেটিকেই অস্বাভাবিক মনে করা, আর যা ভালো তা-ই স্বাভাবিক ধরা।
উদাহরণস্বরূপ: একজন বাবা স্বেচ্ছায় তাঁর সন্তানকে একজন সার্জনের কাছে নিয়ে যান ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে। সার্জন সেই শিশুর দেহ “চিরে ও ছেদ করে” দেয়। এখানে বাবা ও ডাক্তার মিলে একসাথে এই “মন্দ” কাজটি করেছেন। কিন্তু একজন সুস্থ বুদ্ধির মানুষ জানে, এই ছোট কষ্টটি একটি বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্যই করা হয়েছে। কোনো যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কখনো এই বাবাকে বা ডাক্তারকে দোষারোপ করবে না বা বলবে না যে তারা শিশুটির প্রতি মন্দ আচরণ করেছে। বাবা বা ডাক্তারকে সার্জারির সবকিছু বিস্তারিত শিশুকে আগে থেকে ব্যাখ্যা করাও দরকারী নয়। বরং তা করলে শিশুটি আরও ভয় পেতে পারত এবং আরও ক্ষতিগ্রস্ত হত।
একজন ব্যক্তি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটি চিত্র এঁকে ফেলল, যা একটি সম্পূর্ণ দেওয়ালের সমান বড়। কেউ যদি সেই দেওয়ালের একদম সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সে কেবল সেই অংশটুকুই দেখতে পাবে, যা তার সামনে আছে—যেখানে হয়তো গাঢ় রঙ এবং অন্ধকার থিম ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যক্তি পুরো চিত্রটি দেখেনি এবং বাস্তবতা হলো, সে দেখতে পারেও না, তার সীমিত দৃষ্টিশক্তি ও অবস্থানের কারণে। সে বুঝতে পারছে না যে এই অন্ধকার রঙগুলো কিভাবে আরও বড় এবং উজ্জ্বল চিত্রকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে এবং তুলে ধরেছে। এখন, কেউ যদি এই সামান্য একটি অংশ দেখে পুরো চিত্রের সমালোচনা করে, তাহলে সেটা কি ন্যায্য হবে?
যদি মানবিক স্তরে এটি সত্য হয়, তবে আল্লাহর ক্ষেত্রে তো আরও অধিক যুক্তিসঙ্গত হওয়া উচিত। একজন মানুষ, যে নিজ শরীরের কার্যক্রমও বুঝে না, জানে না কীভাবে তার রিযিক পৌঁছে, সে কি করে আল-‘আলীম (সর্বজ্ঞ), আল-‘আদল (সর্বাধিক ন্যায্য), আল-কাদীর (সর্বশক্তিমান), আল-হাকীম (সর্বজ্ঞান) এবং আর-রাহীম (পরম দয়ালু) — এর সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলে?
C. S. Lewis যথার্থই বলেছিলেন: “A man does not call something crooked unless he has some idea of a straight line.” (একজন মানুষ কোনো কিছুকে বাঁকা বলে তখন, যখন তার সোজা রেখা সম্পর্কে ধারণা থাকে।)
কে ঠিক করেন, কী ভালো আর কী মন্দ? আল্লাহ।
কে সবচেয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন প্রতিটি বিষয় ও দিক সম্পর্কে? আল্লাহ।
এখানে একটি বড় সমস্যা হলো, মানব মস্তিষ্কে বিরাজমান অহংকার, ইগো, এবং আত্ম-মুগ্ধতা। আমরা ভাবি, আধুনিক বিজ্ঞানে কিছু অগ্রগতির কারণে আমরা যেন সবকিছু বুঝে ফেলেছি—বিশ্বজগতের সব রহস্য, অস্তিত্বের সব দিক, ইত্যাদি। তাই অনেকেই দ্বিধা করে না আল্লাহর হিকমাহ ও প্রজ্ঞার স্বীকৃতি দিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আল্লাহ আমাদের যা জানা প্রয়োজন তা বলেন, আমাদের যা জানতে ইচ্ছা হয় তা নয়।
এই দুনিয়ায় কি কিছু আছে যা সম্পূর্ণ মন্দ?
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “পরিপূর্ণভাবে খারাপ, এমন কিছু দুনিয়াতে বিদ্যমান নেই—যেখানে কোনো ভালো কোনো দিক নেই। এ দুনিয়ার প্রতিটি মন্দের মধ্যেই অন্তত কিছু ভালো দিক আছে। যেমন, রোগ শরীরের ক্ষতি করে একদিকে, কিন্তু অন্যদিক থেকে ধৈর্যকে পরীক্ষা করে, মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়, এমনকি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। অধিকাংশ অপছন্দনীয় বিষয় এমনই—সেগুলোতে মানুষের জন্য কোনো না কোনো উপকারিতা থাকে।” [শিফা আল-আলিল ফি মাসাঈল]
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা আল্লাহর প্রতি মন্দ কিছু আরোপ করি না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“সকল ভালো আপনার হাতে, আর মন্দ আপনার দিকে সম্বন্ধযুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম]
আল্লাহর প্রতিটি কাজই ভালো—কারণ তা তাঁর কাছ থেকে এসেছে, এবং তাঁর গুণাবলি অনুযায়ী হয়েছে। আল্লাহ সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান, সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, এবং তিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে যথাযথ স্থানে স্থাপন করেন। সুতরাং, কোনো মন্দ যদি ক্বদরের মধ্যে থাকে, তবে সেটা দাসের দৃষ্টিকোণ থেকে, তার কৃতকর্মের পরিণতিস্বরূপ, এবং তা ন্যায্যতা ও পরিপূর্ণ ন্যায়ের উপর ভিত্তি করেই ঘটে।
ইমাম ইবনু আবিল-ইজ্জ رَحِمَهُ ٱللَّٰهُ ব্যাখ্যা করেন:
“আল্লাহ কোনো কিছু এমনভাবে সৃষ্টি করেননি যা শতভাগ মন্দ, যাতে কোনো ভালো দিক নেই। আল্লাহর প্রজ্ঞা তা হতে দেয় না। আল্লাহ এমন কিছু কামনা করেন না যার সবদিক মন্দ এবং যার সৃষ্টিতে কোনো উপকারিতা নেই। সমস্ত ভালো তাঁর হাতেই, আর তাঁর থেকে মন্দ আসে না। সবকিছুই যদি তাঁর পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তা মন্দ হবে না। তাই, যেটা আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত নয়, সেটাই প্রকৃত মন্দ।”
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন:
“সৃষ্ট বস্তু তার উদ্দেশ্যের দিক থেকে ভালো ও সঠিক— যদিও তার কিছু খারাপ দিক থাকে। কারণ খারাপ দিকগুলো গৌণ এবং আংশিক। আর যদি খারাপ কোনো বিষয় উত্তম উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক হয়, তাহলে তা দয়ালু ও প্রজ্ঞাবান সত্তার পক্ষ থেকে ভালোই গণ্য হয়— যদিও দাসের দৃষ্টিতে তা খারাপ হয়। আর যে ব্যক্তি মনে করে, খারাপ দিক ছাড়া ঐ উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব হতো, সে কেবল এই জন্য তা বলে যে, সে আসলে বিষয়গুলোর প্রকৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে অজ্ঞ।” [মাজমু’ আল ফাতওয়া]
দৃশ্যমান অশুভ ও আল্লাহর প্রজ্ঞা
সূরা আল-কাহফ-এ নবী মূসা عليه السلام এবং খিদির عليه السلام -এর কাহিনিতে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই—অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটে, যার পেছনের হিকমাহ আমরা বুঝি না, কিন্তু তা আল্লাহর নিকট সুবিজ্ঞাত। এই কাহিনিতে যেসব কাজ খিদির করেছেন, তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ন্যায্য ও রহমতপূর্ণ—যা আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দেন।
উদাহরণ ১:
বাহ্যিক চিত্র:
খিদির عليه السلام এমন একটি নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত করেন, যার মালিকেরা তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেছিল।
আন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা:
ওই নৌকাটি ছিল কিছু গরিব মানুষের। এক জালিম রাজা সব নৌকা জোরপূর্বক দখল করছিল। খিদির নৌকাটি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত করে সেটিকে সেই জালিম রাজার কবল থেকে রক্ষা করলেন। ফলত, সেই গরিব পরিবার রক্ষা পেল দখলদারিত্ব ও দারিদ্র্যের চরম পরিণতি থেকে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
বাহ্যিক চিত্র: খিদির عليه السلام এমন এক কিশোরকে হত্যা করলেন, যাকে তাঁরা পথে পেয়েছিলেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয়, এটি একজন নিরপরাধ মানুষের ঠাণ্ডা মাথার খুন।
আল্লাহর হিকমাহ: ঐ কিশোর বড় হয়ে অত্যাচারী হয়ে উঠতো, তার পিতা-মাতার অবাধ্য হতো এবং এমনকি তাদের ইসলাম থেকে বের করে দিতো। আল্লাহ তাআলা খিদির عليه السلام -কে ঐ ছেলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন এবং তার পরিণতি জানিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ ছেলেটি অল্প বয়সে মারা যাওয়ার ফলে তাকে জান্নাত দান করা হবে। তার পিতা-মাতাকেও রক্ষা করা হলো এবং তাঁরা মুসলিম হিসেবেই জীবনযাপন করলেন ও আরও উত্তম সন্তান লাভ করলেন, যারা দ্বীনের উপর অবিচল ছিলেন।
তৃতীয় দৃশ্য
বাহ্যিক চিত্র: খিদির (আলাইহিস সালাম) এমন একটি শহরে একটি দেয়াল মেরামত করলেন, যেই শহরের লোকেরা তাঁদেরকে অবজ্ঞা করেছিল এবং সাহায্য করতে অস্বীকার করেছিল।
আল্লাহর হিকমাহ: ঐ দেয়ালটি ছিল ঐ শহরের দুই ইয়াতিম ছেলের, এবং এর নিচে ছিল একটি গুপ্ত ধনভাণ্ডার। যদি দেয়ালটি ভেঙে পড়তো, তাহলে শহরের দুরাচারী লোকেরা তা দখল করে নিতো এবং ইয়াতিমদের কিছুই থাকতো না। কিন্তু দেয়ালটি মেরামতের মাধ্যমে খিদির عليه السلام ধনভাণ্ডারটি রক্ষা করলেন যতক্ষণ না তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং নিজের সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবে শুধু এই কারণে যে আমরা এর পেছনের হিকমাহ বুঝতে পারি না— তাই আল্লাহকে প্রশ্ন করা বা অস্বীকার করা উচিত নয়।
এই বিষয়ে একটি অনবদ্য হাদিস দেখুন:
উমর ইবনুল খাত্তাব رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট কিছু বন্দী আনা হলো, যাদের মধ্যে একটি মহিলা ছিল, যে তার সন্তান খুঁজছিল। সে যখন একটি শিশুকে খুঁজে পেল, তখন তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলো এবং স্তন্যপান করালো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “তোমরা কি মনে করো, এই নারী তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?” আমরা বললাম, “আল্লাহর কসম, সে কখনো তা করবে না।” তখন তিনি বললেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি এই নারীর চেয়ে অধিক দয়ালু।” [বুখারি ও মুসলিম]
পৃথিবীতে যত বিপদ-আপদ, দুর্যোগ, বা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে, তা সবই আল্লাহর জ্ঞান অনুযায়ী হয় এবং আল-লাওহুল মাহফূযে আগে থেকেই লিখিত থাকে। আল্লাহ বলেন:
مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍۢ فِى ٱلْأَرْضِ وَلَا فِىٓ أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِى كِتَبٍۢ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَآ ۚ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٌۭ
“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে যেসব বিপর্যয় আসে, তা তো আমরা সৃষ্টি করার আগেই এক কিতাবে লিখে রেখেছি। এটা আল্লাহর জন্য সহজ।” [সূরা আল-হাদীদ, ২২]
كُلُّ نَفْسٍۢ ذَآئِقَةُ ٱلْمَوْتِ ۗ وَنَبْلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلْخَيْرِ فِتْنَةًۭ ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করবো; এবং আমাদের কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, ৩৫]
أَحَسِبَ ٱلنَّاسُ أَن يُتْرَكُوٓا۟ أَن يَقُولُوٓا۟ ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ وَلَقَدْ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ صَدَقُوا۟ وَلَيَعْلَمَنَّ ٱلْكَذِبِينَ
“মানুষ কি মনে করে তারা বলবে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’—আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অবশ্যই আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের আগে ছিল। তখন আল্লাহ অবশ্যই যাচাই করে নিবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।” [সূরা আল-আনকাবূত, ২–৩]
যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা দেখি যেমন ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, সুনামি, মহামারী ইত্যাদি—এগুলো আল্লাহর অনুমোদনে ঘটে এবং এর পেছনে নিশ্চয় কোনো হিকমাহ রয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য হোক বা না হোক। একইভাবে মানুষের দ্বারা সংঘটিত ‘অশুভ’ ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও এমনই।
আল্লাহ এই দুনিয়া এমন ভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে এটি পরিপূর্ণ শান্তি বা মঙ্গলময় নয়; বরং এটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা বানিয়েছেন। কোনো মানুষের কৃত অপকর্ম হয়তো তার নিজের জন্য এবং কিছু আশপাশের মানুষের জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে, কিন্তু সেটিই অন্য কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেটি ভালো ফলও দিতে পারে যা আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। শেষ পরিণতি সব সময়ই কল্যাণকর হয়, তা যত ‘অশুভ’ বা ‘অকল্যাণকর’ই হোক না কেন। কেন? কারণ, আল্লাহ যা কিছু ক্বদর করেন, তা সবই কল্যাণকর এবং তাঁর বিচার ও হিকমাহর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
আল্লাহ বলেন:
قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلَّا مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَىٰنَا ۚ وَعَلَى ٱللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ ٱلْمُؤْمِنُونَ
“বল, আমাদের প্রতি যা কিছু ঘটবে, তা কেবলমাত্র আল্লাহর লিখিত বিষয়ই হবে। তিনি আমাদের অভিভাবক। এবং আল্লাহর উপরই মু’মিনদের ভরসা করা উচিত।” [সূরা আত-তাওবাহ, ৫১]
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনের জন্য যা কিছু নির্ধারণ করেন, তা সবই তার জন্য কল্যাণকর।” [আহমাদ]
আল্লাহ বলেন:
ظَهَرَ ٱلْفَسَادُ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ ٱلَّذِى عَمِلُوا۟ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের ফলে—যাতে তিনি তাদেরকে তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, হয়তো তারা ফিরে আসবে (তওবা করবে)।” [সূরা আর-রূম, ৪১]
মানুষিক কর্মকাণ্ডের ফসল এবং আল্লাহর অনুমোদনে সংঘটিত বিপর্যয়
এখানে আমরা দেখতে পাই, ‘ফাসাদ’ (দুর্নীতি ও অনাচার) একটি অশুভ বিষয়, যা মানুষের নিজের কর্মকাণ্ডের ফল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ‘ফাসাদ’-এর মধ্যেও চূড়ান্ত কল্যাণ নিহিত থাকে, যাতে মানুষ ফিরে আসে সঠিক পথে।
প্রতিটি বিপর্যয় ঘটে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত নয়। যদি আল্লাহ তা না চাইতেন, তা কখনো ঘটতো না। তবে আল্লাহ তা ঘটার অনুমতি দিয়েছেন, তা নির্ধারণ করেছেন, এবং সেটি সংঘটিত হয়েছে—এবং এতে অবশ্যই কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
"مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُۥ ۚ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمٌۭ"
“কোনো বিপদই আসে না আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত। আর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, তিনি তাদের অন্তরকে পথনির্দেশ করেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ের জ্ঞান রাখেন।” [সূরা আত-তাগাবুন, ১১]
তাফসীর ইবনু কাসীর-এ ইমাম ইবনু কাসীর رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন:
এই আয়াতের অর্থ হলো—যে ব্যক্তি কোনো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং জানে যে এটি আল্লাহর হুকুম ও ক্বদরের মাধ্যমে হয়েছে, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর সাওয়াবের প্রত্যাশা করে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি তার ঈমানকে দৃঢ় করে দেন এবং তার ক্ষতির বিনিময়ে দুনিয়াতে তাকে হিদায়াত ও ঈমানের দৃঢ়তা দান করেন। আল্লাহ তার ক্ষতিগ্রস্ত বস্তুটির পরিবর্তে অনুরূপ অথবা আরও উত্তম কিছু দান করেন।
যখন কেউ জানে যে প্রত্যেক বিপর্যয়ই আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্বদর অনুযায়ী ঘটে, তখন তার উচিত বিশ্বাস স্থাপন করা, আত্মসমর্পণ করা এবং ধৈর্য ধারণ করা। ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত।
আল্লাহ বলেন:
“আর তিনি তাদেরকে প্রতিদান হিসেবে দিবেন —একটি জান্নাত এবং রেশমি পোশাক, কারণ তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল ।” [সূরা আদ-দাহর, ১২]
যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুবরণকারীর অবস্থা তিন রকম
যখন কোনো ব্যক্তি যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুবরণ করে, সে তিন শ্রেণির একটির অন্তর্ভুক্ত হয়:
প্রথম:
সে যদি একজন নিষ্ঠাবান মুত্তাকি ও সৎ বান্দা হন, তবে এটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় মৃত্যুর। আল্লাহ জানেন, যদি সে আরও জীবিত থাকত, তবে হয়তো এই সময়ের মতো পবিত্রতা ও তাকওয়ার ওপর সে অবিচল থাকত না। আল্লাহ চাননি সে তার সর্বোচ্চ ঈমানের স্তরের পরে পিছনে চলে যাক। উপরন্তু, যে কষ্ট তাকে ভোগ করায় সে ধৈর্য ধারণ করেছে, তার মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “এমন কোনো বিপদ একজন মুসলিমকে স্পর্শ করে না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন না— যদিও তা একটি কাঁটার খোঁচা মাত্র হয়।” [বুখারি]
দ্বিতীয়:
সে একজন মুসলিম হলেও পাপাচারে লিপ্ত। আল্লাহ জানেন, যদি সে জীবিত থাকত, তবে আরও অবনতি ঘটত। সুতরাং, এটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় মৃত্যুর, যাতে সে কম গুনাহ নিয়েই আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
তৃতীয়:
সে হতে পারে অবিশ্বাসী বা দুরাচারী। আল্লাহ জানেন, যদি সে আরও বাঁচত, তবে কখনোই ভালো হতো না। তাই তার মৃত্যু সমাজের জন্য একটি রাহাত (মুক্তি)। এই সবকিছু আমরা দেখতে পাই সূরা আল-কাহফ-এ মূসা عليه السلام ও খিদির عليه السلام -এর ঘটনার মধ্যে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“এই দুনিয়ার জীবনের উদাহরণ, আখিরাতের তুলনায়, এমন যেন তোমাদের একজন সাগরে আঙুল ডুবিয়ে দেখুক সে কী নিয়ে বের করে।” [মুসলিম]
এই পৃথিবীতে যা কিছু দুঃখ-কষ্ট, বিপর্যয়, নিরপরাধ শিশুদের হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে কেউ বলতে পারে, “জীবনটা অন্যায়পূর্ণ।” তবে এই কথা তখনই যৌক্তিক হতো, যদি কিয়ামতের দিন না থাকতো—যেদিন সব যালেম বিচার পাবে, এবং আখিরাত না থাকতো—যেখানে পরীক্ষিতরা পুরস্কৃত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ।
শিশুদের হত্যা ও এর হিকমাহ
শিশুদের হত্যা—এতে কী কল্যাণ আছে?
খিদির عليه السلام –এর কাহিনীতে আমরা দেখেছি, যে ঘটনাটি আমাদের দৃষ্টিতে ছিল ঠাণ্ডা মাথায় একটি শিশুর হত্যা, সেটিই বাস্তবে শিশুর জন্য এবং তার পিতা-মাতার জন্য কল্যাণ ছিল।
হিকমাহর বিশাল সমুদ্র থেকে আরেকটি দিক হলো এই হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “কেয়ামতের দিনে শিশুদের বলা হবে: জান্নাতে প্রবেশ করো। তারা বলবে: হে আমাদের রব, (আমরা যাব না) যতক্ষণ না আমাদের পিতা-মাতাও প্রবেশ করে। আল্লাহ বলবেন: আমি দেখি তারা জান্নাতে প্রবেশে ইতস্তত করছে কেন? তারা বলবে: হে রব, আমাদের পিতা-মাতা। আল্লাহ বলবেন: তোমরা সবাই প্রবেশ করো, তোমাদের পিতা-মাতাসহ।” [আহমাদ]
এই ‘অসময়ে’ ও ‘অন্যায়ভাবে’ মারা যাওয়া শিশু এখন হয়ে গেল চিরস্থায়ী মুক্তির কারণ—শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং তার পিতা-মাতার জন্যও।
শিশুদের পরিণতি
এই শিশুদের পরিণতি কী হবে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ এবং সর্বজ্ঞ।
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) বলেন: একবার আনসারদের এক শিশুর জানাযায় নবী ﷺ-কে ডাকা হয়েছিল। আমি বললাম: “হে আল্লাহর রাসূল! এই জান্নাতের পাখিদের একজনের জন্য সুসংবাদ দিন। সে কোনো পাপ করেনি, এবং কোনো পাপ তাকে স্পর্শ করেনি।”
তিনি বললেন: “বিষয়টা এমন নয়, হে আয়িশা। নিশ্চয়ই আল্লাহ জান্নাতবাসীদের কিছু লোককে তাদের পিতার পৃষ্ঠদেশেই সৃষ্টি করেছেন, আর জাহান্নামবাসীদেরও কিছু লোককে তাদের পিতার পৃষ্ঠদেশেই সৃষ্টি করেছেন।” [মুসলিম]
তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহ কাউকে তার ভবিষ্যৎ কর্মের পূর্বাভাস জেনে শাস্তি দেন না, যতক্ষণ না সে তা বাস্তবে করে, এমনটি করলে অন্যায় হতো। আল্লাহ সবাইকে ন্যায়সঙ্গত সুযোগ দেন নিজেকে প্রমাণ করার। আর যারা এই দুনিয়াতে প্রকৃত সুযোগ পায়নি, তাদেরকে আখিরাতে পরীক্ষা করা হবে, এবং সে অনুযায়ী তাদের বিচার হবে।
সহিহ বুখারি-এর একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে—যেসব শিশু বালেগ হওয়ার পূর্বেই মারা গেছে, তারা বারযাখে এক অস্থায়ী বাগানে থাকবে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে, এরপর তাদের স্থান নির্ধারণ করা হবে—জান্নাত বা জাহান্নাম।
ইমাম ইবনুল জাওযী رَحِمَهُ اللَّهُ বলেছেন, “আক্বল (বুদ্ধি) আল্লাহর হিকমাহ (জ্ঞানপূর্ণ প্রজ্ঞা) স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো ঘাটতি বা ত্রুটি নেই। এই স্বীকৃতি তাকে বাধ্য করে এমন কোনো বিষয়ে আপত্তি করা থেকে বিরত থাকতে, যা তার কাছে গোপন রয়ে গেছে। যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় তার কাছে অস্পষ্ট হয়, তখন সেই ভিত্তিকে বাতিল বলে ধরে নেওয়া সঠিক নয়।” [তালবিস ইবলিস]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন, ক্বদরের প্রসঙ্গে যখন আমরা আলোচনা করি, তা হয় মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহর দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। “অকল্যাণ” হচ্ছে মানুষেরই কর্মফল—তার জুলুম, পাপ ও অবিচার। তবে আল্লাহ তা ঘটতে দেন ও সৃষ্টি করেন, যদিও এই কর্মের পেছনে কিছু হিকমাহ (জ্ঞানপূর্ণ উদ্দেশ্য) রয়েছে, তবুও তা পূর্ণরূপে ‘অকল্যান’ নয়।
তিনি আরো বলেন, “যদি আল্লাহ কাউকে কোনো মুসিবত ও পরীক্ষা দ্বারা আবদ্ধ করেন এবং সে ব্যক্তি বুঝে ফেলে যে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে, তবে এটি তার জন্য কল্যাণের লক্ষণ; এই পরীক্ষা তার জন্য পরিশুদ্ধি ও রহমতের রূপ ধারণ করে। পক্ষান্তরে, যদি সে ব্যক্তি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, অভিযোগ করে এবং আল্লাহর কাছে না ফিরে মানুষের দিকেই সাহায্যের আশায় ফিরে, তবে এটি তার জন্য অকল্যাণের লক্ষণ; এই পরীক্ষাই তার জন্য আযাব ও দুর্ভোগে পরিণত হয়।” [তারীকুল হিজরতাইন]
ইবলিসের অকল্যাণ
পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা একান্তই পূর্ণ ‘মন্দ’। এমনকি ইবলিসের সৃষ্টি তাও পূর্ণ ‘মন্দ’ নয়। শয়তান হলো সেই সৃষ্টির রূপ, যার মাধ্যমে সর্বাধিক অকল্যাণ প্রসারিত হয়। তার লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে গোমরাহ করা এবং পথভ্রষ্ট করে আল্লাহর নাফরমানীতে পতিত করা। তবুও, তার সৃষ্টির পেছনে রয়েছে হিকমাহ।
নবী ﷺ বলেন, “আল্লাহ যদি চাহিতেন যেন তাঁর অবাধ্যতা না হয়, তবে তিনি কখনই শয়তানকে সৃষ্টি করতেন না।” [আল-বাইহাকি]
এর দ্বারা বোঝা যায়, শয়তানের সৃষ্টিতে যতোটা ক্ষতি আছে, ততোধিক উপকারিতাও নিহিত আছে। আল্লাহই জানেন এর পূর্ণ হিকমাহ। আমাদের জানাশোনার পরিসীমা তো একটা ‘পিক্সেল’-এর মতো, আর আল্লাহর কাছে রয়েছে পুরো ‘ছবি’— বরং তার চেয়েও বেশি।
ইমাম ইবনু আবিল ইজ্জ رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন:
“সে (ইবলিস) হলো জীবনের কার্যকলাপ, আমল, আকীদা ও ইচ্ছার মধ্যে সবধরনের অশুভতার আধার। সে এমন এক সৃষ্টি, যার কারণে বহু মানুষ ধ্বংস হয়েছে এবং আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজে লিপ্ত হয়েছে। তবুও, সে আল্লাহর কিছু মহৎ ইচ্ছা বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম। তাই তার অস্তিত্ব তার অনুপস্থিতির চেয়ে অধিক প্রিয়।”
এর ব্যাখ্যা তিনি কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেন:
প্রথমত: ইবলিসের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন—তিনি বিপরীত ও বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। যেমন, তিনি ইবলিস সৃষ্টি করেছেন—যে সর্বাধিক অশুভ, এবং জিবরীল عليه السلام -কে সৃষ্টি করেছেন—যিনি সর্বাধিক পবিত্র ও কল্যাণকর। একইভাবে, দিন-রাত, রোগ-অসুখ, জীবন-মৃত্যু, হক-বাতিল সবকিছুতেই বৈপরীত্য রয়েছে, যা আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতা, হিকমাহ ও শাসনের প্রমাণ।
দ্বিতীয়ত: ইবলিসের কারণে আল্লাহর এমন সব নাম প্রকাশ পায়, যেমন আল-‘আদীম (সর্বশক্তিমান), আল-মুনতাকিম (প্রতিশোধগ্রহীতা), আল-জাব্বার (বলপ্রয়োগকারী), আশ-শাদীদুল ইকাব (যিনি কঠিন শাস্তি দেন) ইত্যাদি। এসব নাম ও গুণ প্রকাশ পাওয়ার জন্য অপরাধী ও অমান্যকারী সৃষ্টি হওয়া আবশ্যক।
তৃতীয়ত: ইবলিস এমন কিছু নাম প্রকাশ করে, যা আল্লাহর ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা ও ক্ষমা করার ক্ষমতাকে প্রকাশ করে। যেমন, আল-গাফুর, আত-তাওয়াব, আল-হালীম, আল-‘আফু। যদি পাপী না থাকত, তাহলে এ নামগুলোর প্রভাবই থাকত না।
নবী ﷺ বলেন: “যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তবে আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত, এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন।” [মুসলিম]
চতুর্থত: ইবলিসের মাধ্যমে আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমাহ প্রকাশিত হয়—যিনি সকল কিছু যথাস্থানে রাখেন। তিনি জানেন কাকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে হবে, কে তা গ্রহণ করবে, কে তা প্রত্যাখ্যান করবে। অনেক সময় কোনো অকল্যাণকর বিষয়ই বহু কল্যাণের দরজা খুলে দেয়, যেমন: সূর্য, চাঁদ, বাতাস—এগুলো থেকে ক্ষতির পাশাপাশি অধিক উপকার রয়েছে।
পঞ্চমত: ইবলিস না থাকলে এমন অনেক ইবাদাতই অনুপস্থিত থাকত। যেমন: জিহাদ, যা আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। যদি সবাই মু’মিন হতো, তাহলে জিহাদ থাকত না। নাহী ‘আনিল মুনকার, সবর (ধৈর্য), তাওবাহ, ইখলাসে কুরবানি, দুআ ও ইসতেগফার, শয়তান থেকে আল্লাহর পানাহ চাওয়া ইত্যাদি ইবাদাতও থাকত না।
অবশেষে, কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, “এসব কল্যাণ কি অন্য কোনো পথে অর্জিত হতো না?”—তাহলে এটি একদম ভ্রান্ত প্রশ্ন। এটা এমন, যেন কেউ বলে পিতা ছাড়াই সন্তান, গতিহীন চলাচল, তাওবাহ ছাড়া ক্ষমা, ইত্যাদি।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে: ভালো কাজগুলো অর্জনের জন্য যেসব জিনিস থাকা দরকার, সেগুলো কি কেবল ওই ভালো ফলের কারণে গ্রহণযোগ্য? নাকি সেগুলো সব দিক থেকেই খারাপ ও অপছন্দনীয়? এই প্রশ্নের দুটি দিক থেকে জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর দৃষ্টিকোণ থেকে: আল্লাহ কি এমন কিছু কাজ পছন্দ করেন যেগুলো তিনি প্রকৃত অর্থে পছন্দ করেন না, কিন্তু এগুলো এমন কিছু ভালো ফলের দিকে নিয়ে যায় যা তিনি পছন্দ করেন? এবং দ্বিতীয়ত, মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে: মানুষের জন্য কি এমন কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা বৈধ, যা কষ্টদায়ক বা অপছন্দনীয় হলেও ভালো কিছু অর্জনের উপায়? এই দুটি প্রশ্ন একে অপরের থেকে আলাদা।
প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করতে হবে তা হলো, মন্দ সবসময় অস্তিত্বহীনতার দিকে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ ভালো জিনিসের অনুপস্থিতিই হচ্ছে মন্দ। মন্দের দিকে নিয়ে যাওয়া উপাদানগুলো এই কারণেই মন্দ। কিন্তু সেগুলোর শুধু অস্তিত্ব থাকা অবস্থায় তাতে কোনো মন্দ নেই। উদাহরণস্বরূপ, মন্দ সত্তাগুলো অস্তিত্বশীল সত্তা হিসেবে ভালো, কিন্তু যদি তারা ভালোবাসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে, তখন তারা মন্দ হয়ে যায়। তারা সৃষ্ট হয়েছে চলমান সত্তা হিসেবে। যখন তাদেরকে ভালো জিনিসের জ্ঞান বা অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়, তখন তারা ভালো দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু যখন তা দেওয়া হয় না, তখন তারা নিজেরাই বিপরীত দিকে অগ্রসর হয়। গতি, কেবল গতি হিসেবে বিবেচিত হলে, ভালো। এটি আপেক্ষিকভাবে বা অন্য কিছুর সাথে সম্পর্কিত হলে মন্দ হতে পারে, কিন্তু কেবলমাত্র গতি হিসেবে নয়। সব অশুভই অন্যায় কাজ, যার অর্থ হলো কোনো জিনিসকে ভুল স্থানে স্থাপন করা। যদি সেটি সঠিক স্থানে রাখা হয়, তাহলে তা মন্দ হবে না। অর্থাৎ, মন্দ চরিত্র একটি আপেক্ষিক বিষয়।
এই কারণেই (শরীয়তে) সঠিকভাবে কার্যকর করা শাস্তি সত্তাগতভাবে ভালো, যদিও এটি যার ওপর কার্যকর হয় তার দৃষ্টিকোণ থেকে মন্দ, যেহেতু এটি এমন কষ্ট প্রদান করে যা স্বাভাবিকভাবে সুখের প্রবৃত্তির বিপরীত। অর্থাৎ, ব্যথা তার জন্য মন্দ, কিন্তু কাজটি যখন যথাযথভাবে করা হয়, তখন তা তার ওপর কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ভালো।” [শারহ আত-তাহাওয়িয়্যাহ]
ইবলিসের সৃষ্টি বা আমাদের ওপর আসা কষ্টের আরেকটি উপকার উল্লেখ করেছেন ইমাম ইবনুল কায়্যিম رَحِمَهُ اللَّهُ , তিনি বলেন, “একজন মুমিনের জন্য বিপদ হলো ওষুধের মতো: এটি তার ভেতর থেকে এমন রোগ দূর করে, যা যদি থেকে যেত, তাহলে তা হয় তাকে ধ্বংস করত বা তার ঈমানের মর্যাদা হ্রাস করত। বিপদ ওই রোগগুলোকে সরিয়ে দেয় এবং মুমিনকে পূর্ণ প্রতিদান ও উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে… অতএব, বিজয়, সম্মান ও কল্যাণ অর্জনের জন্য একজন মুমিনের ক্ষেত্রে বিপদ ও পরীক্ষার প্রয়োজন আছে।” [যাদ আল-মা’আদ]
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ رَحِمَهُ اللَّهُ লিখেছেন, “আল্লাহ কখনো পরিপূর্ণ মন্দ সৃষ্টি করেন না। বরং আল্লাহ যেসব কিছু সৃষ্টি করেন, তাতে এমন একটি প্রজ্ঞাময় উদ্দেশ্য থাকে যার মাধ্যমে সেটি ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি কিছু লোকের জন্য মন্দ হতে পারে, এবং সেটি আংশিক বা আপেক্ষিক মন্দ। আর পরিপূর্ণ বা নিরঙ্কুশ মন্দের ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র ও মুক্ত।” [মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া]
আল্লাহ কুরআনে বলেন:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে মানুষের হাতের কামাইয়ের কারণে, যাতে তিনি তাদেরকে তাদের কিছু কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে। [সূরা আর-রূম, আয়াত ৪১]
যেহেতু মন্দ কাজকারী ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় তা করে, তাই তাকে তার কাজের জন্য দায়ী করা হবে। আপনি বলতে পারবেন না যে আল্লাহ তাকে ঐ মন্দ কাজ করার ইচ্ছা দিয়েছেন। বরং আল্লাহ জানতেন যে এটি হবে।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম رَحِمَهُ اللَّهُ বলেন, “কোনো ব্যক্তি খারাপ কাজ করে এবং অন্যায় করে, কিন্তু তাকে ঐ কাজ করার সক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহ। এই সক্ষমতা প্রদান করা ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও যথার্থতা। অর্থাৎ, ঐ ব্যক্তিকে সক্ষম করে তোলা ভালো, কিন্তু তার করা কাজটি মন্দ। আল্লাহ এতে একটি জিনিসকে তার যথাযথ স্থানে স্থাপন করেছেন, এবং এই প্রজ্ঞাময় উদ্দেশ্যের কারণে এটি ভালো, প্রজ্ঞাময় ও কল্যাণকর, যদিও ঐ ব্যক্তির পক্ষ থেকে এর বাস্তবায়ন অপব্যবহার, অযোগ্যতা ও মন্দ।”
এই বিষয়টি দৈনন্দিন জীবনে সহজেই বোঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন অভিজ্ঞ নির্মাতা বাঁকা কাঠ, ভাঙা পাথর বা অসম্পূর্ণ ইটকে একটি উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করেন। তার এই কাজটি যথাযথ, সঠিক ও প্রশংসনীয় বিবেচিত হয়, যদিও ব্যবহৃত উপাদানগুলোতে ত্রুটি রয়েছে। [শিফা আল-আলীল ফি মাসায়িল]
সারসংক্ষেপে বলা যায়:
- পরিপূর্ণ মন্দ বলে কিছু নেই।
- মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মন্দ কাজে জড়াতে বা তা থেকে বিরত থাকতে পারে।
- মন্দকে বোঝা মানুষের জন্য প্রয়োজন যাতে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এবং ভালো কাজ করতে পারে।
- যা আমরা মন্দ মনে করি, তা আসলে দীর্ঘমেয়াদে মন্দ নাও হতে পারে।
- কিছু মন্দ সৃষ্টি হয়েছে মানুষকে বিনয়ী করার জন্য এবং আল্লাহকে চিনে শুধুমাত্র তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য।
- কিছু মন্দ তৈরি হয়েছে বিপুল পরিমাণ ভালোকে তুলে ধরার জন্য।
- কিছু মন্দ প্রয়োজন যাতে মানুষকে পরীক্ষা করা যায় এবং জীবন যে একটি মরীচিকা ও পরীক্ষা – তা বোঝানো যায়।
- কিছু মন্দ প্রয়োজন যাতে মানুষ তার গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হতে পারে বা তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
- কিছু মন্দ প্রয়োজন যাতে মুমিন ও কাফিরদের মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
- জীবনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য এবং আখিরাত ও বিচার দিবসের গুরুত্ব বোঝা এই সকল ‘মন্দ’ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে।
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসের উপকারিতা
তাকদিরের ওপর বিশ্বাসের কিছু উপকারিতা হলো, যদি কারো তাকদিরের ওপর বিশ্বাস দৃঢ় হয়, তাহলে তার তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ ঠিক থাকে। কে দেন? কে নেন? কে রিযিক দেন – শুধুমাত্র আল্লাহ।
এর পাশাপাশি তাওহীদুল উলুহিয়্যাও ঠিক থাকবে, কেননা আল্লাহ ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সব কিছু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। নির্ভরতা শুধু আল্লাহর ওপর, যদিও আমরা আল্লাহপ্রদত্ত উপায় ও উপকরণ গ্রহণ করি। আল্লাহ নির্দিষ্ট কিছু কারণ ও ফলাফল নির্ধারণ করে রেখেছেন।
কারো তাকদিরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে সে অহংকারী হয় না। তোমাকে তোমার সব সাফল্য কে দিল যদি না হয় আল্লাহ? হিদায়াত ও গোমরাহী, এ দুটোই তাকদিরভুক্ত। হিদায়াত (সৎপথ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং এমন বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে আমরা ভালো ও মন্দের মাঝে কিছুটা পার্থক্য করতে পারি। তিনি আমাদের ফিতরাহ দিয়েছেন যেন আমরা সত্য ও ভালোকে পছন্দ করি এবং মন্দ ও অন্যায়কে অপছন্দ করি। আল্লাহ আমাদের ক্ষমতা দিয়েছেন এবং এমন বার্তা পাঠিয়েছেন যা আমাদের উপলব্ধির সীমার বাইরে পথ দেখায়।
ইমাম ইবন আবিল-‘ইজ্জ رَحِمَهُ اللَّهُ লিখেছেন, “যখন আল্লাহ কাউকে ঈমানের দিকে হিদায়াত দেন, তখন তা তার অনুগ্রহের অংশ, অতএব তাঁর জন্য প্রশংসা প্রযোজ্য। আর যখন তিনি কাউকে গোমরাহ করেন, তখন তা তার ন্যায়বিচার থেকে, তাই তাতেও আল্লাহর প্রশংসা প্রযোজ্য।” [শরহ আকীদাহ তাহাওয়িয়্যাহ]
তাই হিদায়াত একটি আল্লাহর অনুগ্রহ। যারা হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা নিজের ইচ্ছায়ই তা করে, অর্থাৎ তারা হিদায়াত গ্রহণ করতে চায় না। তারা গোমরাহ হয়েছে কারণ তারা অহংকারী – তারা শুনতে চায় না। আর যখন তারা সত্য পথ থেকে সরে যায়, আল্লাহ তাদের অন্তরকেও সত্য থেকে সরিয়ে দেন। [সূরা আস-সাফ: আয়াত ৫]
তবে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছেনি বা স্পষ্টভাবে পৌঁছেনি না – অর্থাৎ তা অসম্পূর্ণ বা বিকৃত। এদেরকে আহলুল ফাতরাহ বলা হয় এবং তারা ক্ষমাযোগ্য, যদিও তারা পথভ্রষ্ট।
এই বিশ্বাস যে, যা কিছু ঘটছে তা পূর্বনির্ধারিত, এবং মানুষের জীবনের সময়সীমাও লেখা আছে, একজন মুমিনকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও সাহসী ও স্থিরচিত্ত করে তোলে। এটি বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক হয় তাদের জন্য যারা কঠিন কাজে নিয়োজিত, সংস্কার করতে চায়, বা অত্যাচারীর মুখোমুখি হয়।
একজন মানুষ দুঃখে ভেঙে পড়ে না। সে বুঝতে পারে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। যা কিছু তোমার কাছে পৌঁছেছে, তা কখনোই তোমার হাতছাড়া হওয়ার ছিল না, আর যা তোমার থেকে চলে গেছে, তা কখনোই তোমার কাছে পৌঁছানোর ছিল না। যদি পুরো দুনিয়া একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করতে চায়, তারা কখনোই পারবে না যদি না আল্লাহ তা লিখে রাখেন। আর যদি পুরো দুনিয়া একত্রিত হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা তাও পারবে না যদি না আল্লাহ তা লিখে রাখেন। কলম উঠিয়ে ফেলা হয়েছে, পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে। এটি একজন মুমিনকে শক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস দেয়।
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে একজন ব্যক্তি স্বার্থপর হয়ে পড়ে। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে “যোগ্যরাই টিকে থাকা”। এটি ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। মানুষকে বোঝা উচিত যে, আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় এবং তিনিই সবকিছুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছেন। যদি তা না হয়, তাহলে মানুষ হয় জীবনকে অত্যন্ত অন্যায় মনে করবে, নয়তো তার আকাঙ্ক্ষা পূরণে যেকোনো উপায়ে চেষ্টা করে যাবে।
ইমাম ইবন হজর আল-আসকালানি رَحِمَهُ اللَّهُ আল-সামআনিকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন: “এই (তাকদিরের) বিষয়ে জ্ঞানের পথ হলো কুরআন ও সুন্নাহর সীমায় থাকাকে কেন্দ্র করে — কেবল যুক্তি বা অনুমানের আশ্রয় না নেওয়া। যে ব্যক্তি (নসের ওপর) স্থির না থেকে অন্য পথে যাবে, সে বিভ্রান্ত হবে এবং সন্দেহের সাগরে ডুবে যাবে। সে এমন কিছু অর্জন করতে পারবে না যা অন্তরকে শান্তি দেয় বা হৃদয়কে সন্তুষ্ট করে, কারণ তাকদির হলো আল্লাহর গোপন রহস্যগুলোর মধ্যে একটি।” [ফাতহুল বারী]
প্রশ্নগুলোকে সেই সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন, যেটুকু সম্পর্কে রাসূল ﷺ কথা বলেছেন। তাকদিরের ব্যাপারে অতিরিক্তভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। বরং এই প্রশ্ন করুন—আমাকে সফলতা অর্জনের জন্য কী করতে বলা হয়েছে? আল্লাহ আমার জন্য কী শরিয়ত করেছেন? আর কোন বিষয়গুলো থেকে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে? যদি আপনি তাকদিরের ব্যাপারে অতিরিক্ত গভীরে প্রবেশ করেন, তাহলে একসময় সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তখন এমন সময় আসবে, যখন আপনাকে বলতে হবে—“سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا“—আমরা শুনেছি এবং আমরা মান্য করেছি।
তাকদির এমন একটি বিষয়, যার কিছু অংশ কখনোই আপনি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে বা আয়ত্ত করতে পারবেন না। দিনশেষে, মানবীয় বুদ্ধি একা-একা আল-ক্বদরের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে না, কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্ট জগতের এক রহস্য। আমাদের প্রতিপালক যা কিতাবে বা তাঁর রাসূলের ﷺ মুখনিঃসৃত বাণীর মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন, আমরা সেটাই জানি, বিশ্বাস করি এবং গ্রহণ করি। আর যা আমাদের জানানো হয়নি, তাতেও আমরা বিশ্বাস করি—আমাদের রবের পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞায় বিশ্বাস রাখি। “তিনি যাই করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং আমাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।”
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।








No Comment! Be the first one.