এই লেখাটি শাইখ ড. সাজিদ উমর-এর একটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ থেকে নেওয়া হয়েছে, যা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিষয়ে ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজরি’ কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল।
এই প্রবন্ধে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদান করা হয়েছে:
- ইসলামে মুদ্রার ধারণাটি কি ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত?
- ওজনের দিক থেকে দিনার ও দিরহামের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
- ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য কোনো ধাতু দিয়ে সর্বপ্রথম কে মুদ্রা তৈরি করেন এবং সেই মুদ্রার নাম কী ছিল?
- সর্বপ্রথম ইসলামিক স্বর্ণমুদ্রা কে তৈরি করেন?
- প্রথম ইসলামিক স্বর্ণমুদ্রা তৈরির ঘটনাটি ইসলামি ফিকহের পরিমণ্ডলে মুদ্রার ধারণার ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল?
- সম্পদ ও মুদ্রার বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী এবং ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে মুদ্রার সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য কোনটি?
- ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে ফিয়াট মুদ্রা (কাগুজে মুদ্রা) কি মুদ্রা হিসেবে গণ্য? এবং কেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে মুদ্রার ধারণা
মুহাম্মদ ﷺ যখন নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরিত হন, তখন আরবের লোকেরা রোমান স্বর্ণমুদ্রা ‘দিনার’ এবং পারস্যের রৌপ্যমুদ্রা ‘দিরহাম’ ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য করত। সেই সময়ে এই ধাতুগুলো ওজনের ভিত্তিতে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিছু সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেই যুগে মূল্যের দিক থেকে সাতটি স্বর্ণমুদ্রা দশটি রৌপ্যমুদ্রার সমান ছিল। এই বিনিময় হার প্রতিটি মুদ্রায় বিদ্যমান ধাতুর ওজনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তৎকালীন প্রচলিত মুদ্রার মাধ্যমে জনগণের ব্যবসাকে মৌন সম্মতি দিয়েছিলেন এবং পরিস্থিতি সেভাবেই চলতে থাকে। তবে যখন ‘রিবা’ (সুদ) নিষিদ্ধ করা হয়, তখন স্বর্ণ ও রৌপ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি আরোপ করা হয়েছিল।
মুদ্রার ব্যবহার এভাবেই চলতে থাকে উমর رضي الله عنه-এর সময় পর্যন্ত। তিনি তাঁর খিলাফতকালে রোমান দিনারের আদলে স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরি করেন। একে ‘ফালস’ বলা হতো। কখনও তিনি এই মুদ্রাগুলোতে নিজের নাম খোদাই করতেন, আবার কখনও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ), ‘বিসমিল্লাহ’ (بِسْمِ ٱللَّٰهِ) এবং ‘আল্লাহু রাব্বি’ (الله ربي)-এর মতো বাক্য লিখতেন।
একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন সমাজগুলো মানুষের চাহিদা পূরণে মুদ্রার অন্তর্নিহিত প্রকৃতিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং মুদ্রার মাধ্যমে কীভাবে ধারণা ও পরিচয় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা উপলব্ধি করেছিল। এর কারণ হলো, মুদ্রা মানুষের জীবনে এমনভাবে মিশে ছিল যে, এর মাধ্যমে সমাজের সকলের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে সহজ ছিল। আজ আমরা এই কাজের জন্য মিডিয়া ব্যবহার করি!
এবার উমর رضي الله عنه-এর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। তিনি ‘ফালস’ মুদ্রা চালু করার পাশাপাশি উটের চামড়াকে মুদ্রা হিসেবে চালু করার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু শূরা (পরামর্শ) করার পর তাঁকে এই কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ তাঁকে বলা হয়েছিল যে, যদি তিনি এটি করেন, তবে উটের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ভয় রয়েছে।
‘ফালস’ প্রবর্তনের পর আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খিলাফত পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল। তিনি ছিলেন ৫ম উমাইয়া খলিফা এবং প্রায় ৬৫ হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন। তাঁর সময়েই সর্বপ্রথম ইসলামি স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা তৈরি করা হয়।
ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে আব্দুল মালিকের এই কাজটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এর মাধ্যমেই আমরা প্রথমবারের মতো মুদ্রা ও তা জারি করার বিষয়ে ইসলামি ফিকহের পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র বিশ্বদৃষ্টি দেখতে পাই, যেখানে মুদ্রা জারি করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়!
কাগুজে মুদ্রা আবিষ্কারের আগে মুদ্রার ইতিহাসের সারসংক্ষেপ এটাই। আলোচিত বিষয়গুলোকে সংক্ষেপে এভাবে বলা যেতে পারে:
- মানব সভ্যতার শুরু এবং ব্যবসার সূচনা থেকেই আমরা দেখতে পাই যে, মুদ্রার ধারণাটি এমন কিছুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল যা অন্য কিছু অর্জনের মাধ্যম হবে, কিন্তু নিজে চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে না।
- আমরা লক্ষ্য করি যে, মুদ্রার জন্ম ও বিকাশ এমন কিছুর ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল যা ব্যবসাকে সহজ করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানবজাতিকে আরও উন্নত ও টেকসই উপায়ে একে অপরের শক্তিকে কাজে লাগাতে সাহায্য করে।
- এবং আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ তা‘আলা এই বিষয়টি মানবজাতির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করে নিতে পারে। একারণেই আমরা কুরআন বা হাদিসে মুদ্রার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা খুঁজে পাই না।
ইসলামে মুদ্রার বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে ফিকাহবিদগণ (ফুকাহা) মুদ্রার বৈশিষ্ট্য (وظائف النقود) নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এর পাশাপাশি তাঁরা সম্পদের বৈশিষ্ট্য (وظائف المال) নিয়েও আলোচনা করেছেন। আমি এখানে এই পার্থক্যটি উল্লেখ করছি, কারণ আমি লক্ষ্য করেছি যে কিছু ইলম অন্বেষণকারী ছাত্র এই আলোচনায় সম্পদ ও মুদ্রাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে ফেলেন। যদিও সামগ্রিকভাবে সম্পদ নিয়ে আলোচনার সময় এটি করা যেতে পারে, তবে ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে মুদ্রা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এটি একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতি নয়। এমনকি এটি ফুকাহাদের লেখনীর সাথেও পুরোপুরি মেলে না, কারণ উভয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
ফুকাহাদের আলোচনায় আমরা ‘আল-মালিয়্যাহ’ (المالية), ‘আত-তাকাওয়্যুম’ (التقوم) এবং ‘আছ-ছামানিয়্যাহ’ (الثمنية)-এর মতো পরিভাষা দেখতে পাই, যার মধ্যে প্রথম দুটি সাধারণভাবে সম্পদের সাথে এবং তৃতীয়টি বিশেষভাবে মুদ্রার সাথে সম্পর্কিত।
- প্রথম পরিভাষা, ‘মালিয়্যাহ’ বলতে এমন কোনো প্রয়োজনীয় বা কাঙ্ক্ষিত বস্তুকে বোঝায় যা ইসলামে বৈধ বলে বিবেচিত কোনো সুবিধা প্রদান করে। সুতরাং, উদাহরণস্বরূপ, বাদ্যযন্ত্র এবং মদ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। এই সহজ ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, ‘মালিয়্যাহ’-এর ধারণাটি কেবল মুদ্রার জন্য নির্দিষ্ট নয়।
- দ্বিতীয় পরিভাষা, ‘তাকাওয়্যুম’ বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যা ইসলামি আইন অনুযায়ী বৈধভাবে বিনিময় করা যায়। এই পরিভাষাটি মূলত হানাফী মাযহাবের আলেমগণ ব্যবহার করেন, যদিও এর মূল ধারণাটি সকল ফিকহী মাযহাবেই বিদ্যমান। এই মানদণ্ডের কারণে নিষিদ্ধ পণ্য, যেমন—বাদ্যযন্ত্র বা মদের ব্যবসা করা যাবে না। একইভাবে, কোনো বৈধ বস্তু, যেমন—একটি গাড়ি, যদি চুরি করা হয়, তবে তা বিনিময় করা যাবে না। এটিও বিশেষভাবে মুদ্রার জন্য নির্দিষ্ট নয়।
- তৃতীয় পরিভাষা, ‘ছামানিয়্যাহ’ বিশেষভাবে মুদ্রার সাথে সম্পর্কিত। ফুকাহাগণ এই পরিভাষাটি ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত রিবা এবং বিশেষত স্বর্ণ ও রৌপ্য বিনিময়ের অধ্যায়ে ব্যবহার করেন, যখন তারা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওপর ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত রিবার বিধান প্রযোজ্য হওয়ার পেছনের কারণ বা ‘ইল্লাহ’ (علة) নিয়ে আলোচনা করেন।
যখন কেউ ‘ছামানিয়্যাহ’ এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য সম্পর্কে ফুকাহাদের সম্মিলিত আলোচনা পর্যবেক্ষণ করেন, তখন প্রধানত দুটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পান। আমি ‘প্রধানত’ শব্দটি ব্যবহার করছি কারণ কিছু ফুকাহা আরও কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, যা ‘ছামানিয়্যাহ’-এর ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে।
প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. এমন কিছু, যাকে সমাজ একটি মানদণ্ড হিসেবে মেনে নেয়, যার মাধ্যমে অন্য সকল সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা বলি একটি গাড়ির দাম এতগুলো রৌপ্যমুদ্রা, আর একটি বাড়ির দাম এতগুলো স্বর্ণমুদ্রা।
২. এমন কিছু, যাকে সমাজ নির্দিষ্ট ও ব্যাপক উভয় পর্যায়ে বিনিময়ের বা কিছু কেনার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। আমি এখানে ‘ব্যাপক পর্যায়’ শব্দটি উল্লেখ করেছি যাতে কিছু ফুকাহা যাকে প্রথাগত মুদ্রা বা ‘আন-নাকদ আল-উরফি’ (النقد العرفي) বলেছেন, তা বাদ দেওয়া যায়। কারণ প্রথাগত মুদ্রা শুধু একটি নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ স্থানে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
এই দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি বোঝায় যে, মুদ্রার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করা সম্ভব। একারণে সমাজ এটিকে মূল্যবান মনে করে এবং এর মাধ্যমে নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য এটিকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে, কারণ এটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।
এই দুটি বৈশিষ্ট্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ফুকাহাদের দৃষ্টিতে কোনো কিছুর মুদ্রা হয়ে ওঠাটা কেবল তার অন্তর্নিহিত মূল্যের ওপর নির্ভর করে না।
এ কারণেই যখন আমরা ইসলামের বিভিন্ন শতাব্দী ধরে মাযহাবগুলোর আলেমদের সম্মিলিত মতামতের দিকে তাকাই, তখন আমরা দেখতে পাই যে এক বিশাল সংখ্যক আলেম স্বর্ণ ও রৌপ্যকে মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এর কারণ শুধু এগুলোর ওজন ছিল না, বরং সমাজ এগুলোকে মূল্যের মানদণ্ড এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
এখন, মুদ্রার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করার আগে, আমাদের স্বর্ণ ও রৌপ্য এবং ‘ছামানিয়্যাহ’-এর ধারণার ক্ষেত্রে ফুকাহাদের দ্বারা আলোচিত ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত রিবার বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
এর কারণ কী? কারণ যদি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা হয় এবং রিবার বিধান উভয়টির ওপর প্রযোজ্য হয়, তবে এমন কি অন্য কোনো বস্তু পাওয়া সম্ভব, যার ওপরও রিবার বিধান প্রযোজ্য হবে এবং সে কারণে আমরা সেটিকেও মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করতে পারব?
উদাহরণস্বরূপ, আজ আমাদের কাছে পাউন্ড, ডলার, দিরহাম, রিয়াল ইত্যাদি ফিয়াট মুদ্রা রয়েছে। আমরা এই সবগুলোকেই মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করি। কোন যুক্তিতে আমরা তা করি? এগুলো কি ইসলামে মুদ্রা হিসেবে গণ্য?
যখন আমরা ফুকাহাদের আলোচনা দেখি, তখন আমরা দুটি দৃষ্টিভঙ্গি পাই:
প্রথমত, ‘গালাবাত আছ-ছামানিয়্যাহ’ (غلبه الثمنية)-এর দৃষ্টিভঙ্গি: এটি ইমাম মালিক رحمه الله ও ইমাম শাফিঈ رحمه الله-এর মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমাদ رحمه الله-এর একটি বর্ণিত মত। আমি এখানে ‘বর্ণিত মত’ বলছি, কারণ এই বিষয়ে তাঁর একাধিক মত পাওয়া যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, স্বর্ণ ও রৌপ্য গয়না, বর্ম, অস্ত্র এবং এমনকি অন্য ধাতুর ওপর প্রলেপ দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সমাজের বিবেচনায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের প্রধান ব্যবহার হলো বিনিময়ের মাধ্যম এবং মূল্যের পরিমাপক (অর্থাৎ ছামানিয়্যাহ) হওয়া। আর একারণেই স্বর্ণ ও রৌপ্যে রিবা নিষিদ্ধ।
একটি তথ্য হিসেবে উল্লেখ্য, ফিকহের কিতাবে যাকাত ও রিবার অধ্যায়ে স্বর্ণ ও রৌপ্যকে প্রায়ই ‘নাকদাইন’ (النقدين) বা ‘দুই প্রকার মুদ্রা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
যেসব আলেম এই মত পোষণ করেন, তাদের যুক্তি হলো স্বর্ণ ও রৌপ্যে রিবা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এগুলো স্বয়ং স্বর্ণ ও রৌপ্য, অন্য কোনো কারণে নয়।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে কোনো বিধানের পেছনের কারণকে এভাবে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকে ‘আল-ইল্লাতুল কাসিরাহ’ (العلة القاصرة) বলা হয়, যা দ্বারা বোঝায় যে কোনো একটি বিধানের কারণ শুধুমাত্র ওই নির্দিষ্ট বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য মদের উদাহরণ নেওয়া যাক।
আমরা জানি এটি হারাম। কিন্তু কেন এটি হারাম? এটি কি কেবল মদ হওয়ার কারণে হারাম, যা ‘আল-ইল্লাতুল কাসিরাহ’-এর আওতায় পড়বে?
নাকি এটি নেশা তৈরি করে বলে হারাম?
যদি দ্বিতীয়টি কারণ হয়—অর্থাৎ এটি নেশা তৈরি করে—এবং এটিই যদি মদ হারাম হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে আমরা হারামের এই বিধানটি নেশা সৃষ্টিকারী অন্য সবকিছুর ওপরও প্রয়োগ করতে পারব। কারণ তখন বিধানটি কেবল মদের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে না, বরং নেশা সৃষ্টিকারী সবকিছুর জন্যই প্রযোজ্য হবে।
এবার স্বর্ণ ও রৌপ্যের আলোচনায় ফিরে আসি। এগুলোর ওপর কি রিবার বিধান প্রযোজ্য হয়, কারণ অন্যান্য ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও এগুলোর প্রধান পরিচিতি হলো মুদ্রা, যেহেতু এগুলো মূল্যের মানদণ্ড ও বিনিময়ের মাধ্যম (অর্থাৎ ছামানিয়্যাহ)? যদি তাই হয়, তবে ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত রিবার বিধান কেবল এগুলোর ওপরই প্রযোজ্য হতে পারে, কারণ অন্য কোনো বস্তু স্বর্ণ ও রৌপ্যের ভূমিকা পালন করতে পারে না। এর স্বাভাবিক অর্থ দাঁড়ায় যে, স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য কিছুই মুদ্রা হতে পারে না।
একদল আলেম এই মতটিই পোষণ করতেন। তারা বলেন: হ্যাঁ, কেবল স্বর্ণ ও রৌপ্যই মুদ্রা হতে পারে।
তাহলে এর দ্বারা উমর رضي الله عنه-এর সময়ে প্রবর্তিত ‘ফালস’-এর অবস্থান কী দাঁড়ায়?
এই আলেমদের মতে, ‘ফালস’-এর ওপর রিবার বিধান প্রযোজ্য হবে না, কারণ ‘ফালস’ তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুগুলো অন্যান্য সম্পদ তৈরিতে বেশি পরিচিত ছিল। তাই এগুলো কখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, যার মাধ্যমে অন্যান্য বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করা যায়, সামান্য মূল্যের বস্তু ছাড়া।
সুতরাং, যদিও ‘ফালস’ সামান্য মূল্যের জিনিস বিনিময়ের মাধ্যম ছিল, এটি ‘ছামানিয়্যাহ’-এর ধারণাকে প্রয়োজনীয় স্তরে অর্জন করতে পারেনি। তাই এটি বিনিময়ের মাধ্যম হলেও মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
ইসলামি আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুক্তির উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এই আলেমগণ বলছেন না যে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। তারা শুধু বলছেন যে স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য কিছুই মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত হতে পারে না।
এই বিষয়টি মাথায় রেখে, আসুন আমরা দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাই, যা হলো ‘মুতলাক আছ-ছামানিয়্যাহ’ (مطلق الثمنية)-এর দৃষ্টিভঙ্গি।
এই মতটি মালিকি মাযহাবের একটি সংখ্যালঘু মত, ইমাম আহমাদ رحمه الله-এর একটি বর্ণিত মত এবং ইবনে তাইমিয়্যাহ رحمه الله-এর মতো ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সমর্থিত একটি মত। এটি তাবিঈদের সময়কার আলেমদের থেকেও বর্ণিত হয়েছে এবং এটিই আজকের যুগের অধিকাংশ পরবর্তী ও সমসাময়িক আলেম এবং ফিকহ কাউন্সিলের মত। এর ভিত্তিতেই আজকের ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে ফিয়াট মুদ্রাকে মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে!
তাহলে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি কী? এটি হলো, যে কোনো বস্তু যা ব্যাপকভাবে ‘ছামান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়—অর্থাৎ মূল্যের মানদণ্ড এবং বিনিময়ের মাধ্যম—তাকেই মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলস্বরূপ, এর ওপর রিবার বিধান প্রযোজ্য হবে, যদিও সেই বস্তুর অন্যান্য পরিচিত ব্যবহারও থাকে। সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ কোনো বস্তুকে মূল্যের পরিমাপক এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ না করে এবং এর মাধ্যমে কোনো বড় ক্ষতি ছাড়াই মানুষের আর্থিক ও সম্পদ-সম্পর্কিত আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটিকে মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে, এর ওপর রিবা এবং যাকাত উভয় বিধানই প্রযোজ্য হবে। এই মতের ওপর ভিত্তি করে, ‘ফালস’-কেও মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হবে। ঠিক যেমনভাবে স্বর্ণ ও রৌপ্য তার যুগে মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হতো, তেমনি আজকের ফিয়াট মুদ্রাও ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখন হানাফী মাযহাবের অবস্থান কী? আমরা এখনও এই আলোচনায় তাদের কথা উল্লেখ করিনি! আলোচনার পূর্ণতার জন্য আমাদের তা করতে হবে।
হানাফী মাযহাবকেও আমরা বর্তমানে আলোচিত এই দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতেই রাখব; সে অনুযায়ী ‘ফালস’-কে মুদ্রা হিসেবে গণ্য করা হবে। এর কারণ হলো, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওপর রিবার বিধান প্রযোজ্য হওয়ার কারণ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হলেও, বিশেষত ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী رحمه الله এবং সাধারণভাবে হানাফী মাযহাব মুদ্রাকে মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে ‘আল-ইসতিলাহ’ (الاصطلاح)-এর ধারণাকে অনুমতি দেয়। এর অর্থ হলো, যদি একদল মানুষ একত্রিত হয়ে কোনো কিছুকে মূল্যের পরিমাপক এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে একমত হয়—অর্থাৎ তারা এটিকে ‘ছামানিয়্যাহ’-এর মর্যাদা প্রদান করে—তবে তা ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে মুদ্রা হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ওপর ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত রিবার বিধান প্রযোজ্য হবে।
আমি আশা করি, এই উপস্থাপনার মাধ্যমে আমরা ফুকাহাদের চিন্তার গভীরতা এবং এই আলোচনাগুলোতে তাদের সূক্ষ্মতার অন্বেষণ উপলব্ধি করতে পারব।
কিছু ফুকাহা কর্তৃক উল্লিখিত মুদ্রার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে, ইমাম গাজ্জালী رحمه الله বিখ্যাতভাবে একটি ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন:
أن يكون مخزونا للقيم والثروة
এর অর্থ হলো, মুদ্রার এমন একটি বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত যে, এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য তার মূল্য ধরে রাখতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময়, যেমন—দুর্দিনে, এটি ব্যবহার করা যায়।
অন্যান্য আলেমগণ আরও একটি শর্ত যুক্ত করেছেন:
أن يكون معيارا للمدفوعات الآجل
এর অর্থ হলো, মুদ্রা এমন একটি মাধ্যম হওয়া উচিত, যার দ্বারা বিলম্বিত লেনদেনের মূল্য সফলভাবে নির্ধারণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমি কারও কাছে এক বছর পর মূল্য পরিশোধের শর্তে কিছু বিক্রি করি, তবে মুদ্রার মাধ্যমে সেই লেনদেনের মূল্য সফলভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হওয়া উচিত।
পুনরায় বলছি, এই সবগুলোই ফুকাহাদের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে যে মুদ্রা কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং মুদ্রার বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে বোঝা যায়। আর যদি আমরা স্বর্ণ ও রৌপ্যের দিকে তাকাই, তবে আমরা দেখতে পাই যে এটি এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য পূরণ করে। একইভাবে, আজকের ফিয়াট মুদ্রাও তাই করে, যদিও স্বর্ণ ও রৌপ্যের মতো দক্ষতার সাথে নয়।
আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।








No Comment! Be the first one.