আমার সহকর্মী শায়েখ আহমাদ আব্দুল ওয়াহহাব বর্ণিত দু’আ ও পরিবর্তনের একটি সুন্দর ঘটনা।
আমার প্রিয় শায়খ, মসজিদে নববীর ‘শায়খুল কুররা’ (প্রধান ক্বারী ও শিক্ষক) শায়খ ইবরাহিম আল-আখদার رحمه الله বর্ণিত তাওবার এক চমৎকার কাহিনি বর্ণনা করেন।
শায়খ আলী সুবাই’ رحمه الله ছিলেন মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কুরআন ও ইসলামের একজন মহান আলেম।
তিনি ছিলেন শায়খ আমির সায়্যিদ উসমানের অন্যতম প্রধান শিক্ষক, যিনি পরবর্তীতে মিশরের ‘শায়খুল কুররা’ হয়েছিলেন এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রখ্যাত কুরআন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি শায়খ ইবরাহিম আল-আখদারেরও কুরআনের শিক্ষক ছিলেন। সুতরাং শায়খ ইবরাহিম رحمه الله মূলত তাঁর শিক্ষকের শিক্ষকের ঘটনাটিই বর্ণনা করছেন।
তিনি বলেন:
শায়খ আলী সুবাই’ رحمه الله অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর দু’আ মুস্তাজাব ছিল (অর্থাৎ কবুল হতো), তাই মানুষ তাঁকে অত্যন্ত সমীহ করত। তিনি দৃষ্টিহীন ছিলেন, কিন্তু কুরআনের দারসের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অপরিসীম। তিনি একাই লাঠিতে ভর করে মানুষের কাছে পথের ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে করতে সেই মসজিদ বা ভবনে পৌঁছাতেন, যেখানে তাঁর কুরআনের ক্লাস থাকত।
একদিন তিনি কায়রোর আবুল ‘ইলা নামক এলাকায় তাঁর কুরআনের ক্লাসে যাচ্ছিলেন। লাঠিতে ভর করে একা একা হেঁটে যখন তিনি কুরআন শিক্ষাকেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, “মাকরাআতুল আবুল ‘ইলা (আবুল ‘ইলার কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র) কোথায়?”
তিনি যে লোকটির কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে ছিল অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির। সে শায়খকে সঠিক জায়গায় না পাঠিয়ে একজন পতিতার কক্ষে পাঠিয়ে দিল। ফলে, সেই অসহায় ও সরল শায়খ লোকটির দেখানো পথেই চলতে লাগলেন। তিনি লাঠি দিয়ে সিঁড়ি অনুভব করে উপরে উঠতে লাগলেন।
সিঁড়ির উপরেই সেই নারী দাঁড়িয়ে ছিল।
সে বলল, “আপনি কী চান?”
তিনি একজন নারীর কণ্ঠ শুনলেন, যা তিনি আশা করেননি।
শায়খ আলী رحمه الله বললেন, “আমি আবুল ‘ইলার মাকরাআহ (কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র) খুঁজছি।”
এই নারী, যে সাধারণত অবৈধ পন্থায় নিজের কামনা বিক্রি করে, সে যখন দেখল যে এই ব্যক্তি একটি কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র খুঁজছেন, তখন সে ভয় ও লজ্জায় কাঁপতে শুরু করল।
সে বলল, “আচ্ছা, অনুগ্রহ করে ভেতরে আসুন।”
তিনি বললেন, “না! আমি আবুল ‘ইলার মাকরাআহ খুঁজছি! মাকরাআহ কোথায়?!”
তিনি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় বা শক্তি নেই) বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন।
নারীটি বলল, “শায়খ! দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন! শুধু এক মুহূর্ত!”
তিনি বললেন, “কী হয়েছে?”
নারীটি যেকোনোভাবে তাঁর সেবা করতে চাইছিল।
সে বলল, “আপনি ভেতরে এসে বিশ্রাম নিন, তারপর আমি আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি শিক্ষাকেন্দ্রটি কোথায়।”
তিনি বললেন, “না।”
সে বলল, “আচ্ছা, তাহলে এক মিনিটের জন্য বাইরে অপেক্ষা করুন, আমি অন্তত আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে এক গ্লাস পানি পান করাই।”
তিনি বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। নারীটি ভেতরে গিয়ে তাঁর জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো। তিনি পানি পান করে গ্লাসটি তাকে ফেরত দিলেন।
এরপর নারীটি বলল, “শায়খ, দয়া করে আমার জন্য দু’আ করুন।”
তিনি দু’আ করলেন, “হে আমার মেয়ে, আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করুন।”
ব্যস, এটুকুই।
নারীটি তাঁকে মাকরাআহ’র পথ দেখিয়ে দিল। “সোজা গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবেন। সেখানেই মাকরাআহ পেয়ে যাবেন।”
এরপর সে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সে আল্লাহর কাছে তাওবা করে বলল, আমি আর কখনো এই পাপের দরজা খুলব না। সে গোসল (তাওবার গোসল) করে নিল এবং সেই মুহূর্ত থেকেই তাওবা করল।
এক ধনী ব্যক্তির ছেলে, যে তার প্রেমে আসক্ত ছিল এবং প্রায়ই তার কাছে আসত, সেদিনও তার কাছে এসে দরজায় কড়া নাড়ল। কিন্তু সে দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানাল।
ছেলেটি দরজায় আঘাত করতেই থাকল এবং হাল ছাড়ল না।
অবশেষে নারীটি দরজা খুলে বলল, “তুমি কী চাও?”
ছেলেটি বলল, “আরে এটা আমি!”
সে বলল, “চলে যাও! আমি তোমাকে এখানে আর কখনো দেখতে চাই না! চলে যাও!”
সে বলল, “কী! কিন্তু কেন?!”
নারীটি বলল, “যা বলেছি তাই! এখানে আর কখনো আসবে না! এমনকি এই পাড়ার কাছেও আসবে না!”
সে বলল, “আমি তো অমুক!”
নারীটি বলল, “তুমি যেই হও তাতে আমার কিছু যায় আসে না! চলে যাও। এই (পাপের) দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।”
ছেলেটি প্রায় পাগল হয়ে গেল, কারণ সে তার প্রেমে উন্মত্ত ছিল। সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল, কিন্তু নারীটি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলল, “তোমার জন্য আকাশে উড়ে যাওয়া এর চেয়ে বেশি সহজ হবে!”
যখন ছেলেটি বুঝতে পারল যে আর কোনো আশা নেই, তখন সে বলল, “ঠিক আছে, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
নারীটি বলল, “তুমি কি পাগল?! তুমি এক সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারের সন্তান! তুমি একজন চরিত্রহীনা পতিতাকে বিয়ে করতে চাও?! দয়া করে চলে যাও এবং আর কখনো ফিরে এসো না! আমাকে বিয়ে করার চেষ্টা কোরো না। আমার কাছে আসারও চেষ্টা কোরো না!”
ছেলেটি বলল, “কখনোই না! আমি তোমাকে বিয়ে করবই! আকাশ যদি জমিনের উপরও ভেঙে পড়ে (তবুও আমি তোমাকে বিয়ে করা থেকে বিরত হব না)! আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না।”
সে অনবরত চেষ্টা ও অনুনয়-বিনয় করতে থাকল, অবশেষে নারীটি তাকে বিয়ে করতে রাজি হলো।
তাদের বিয়ে হলো। আল্লাহ ছেলেটিকে তার ব্যবসায় দারুণ সফলতা দান করলেন এবং তাকে প্রচুর ধন-সম্পদ দিলেন।
তাদের সন্তান-সন্ততিও হলো।
প্রতি বছর সেই নারী তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে শায়খ আলী সুবাই’ رحمه الله-এর সাথে দেখা করতে যেত। সে তাঁকে প্রচুর অর্থ, হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে আসত। এটা সেই সময়ের কথা, যখন মিশরে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল, যার মূল্য ছিল অনেক বেশি।
সে শায়খ আলীকে বলত, “শায়খ, অনুগ্রহ করে এগুলো নিন এবং আপনার ছাত্র, দরিদ্র এবং অভাবী মানুষদের মাঝে বিতরণ করে দিন। কাউকে বাদ দেবেন না।”
প্রতি বছর সে তাঁর কাছে আসত এবং যাকাত ও সাদাকা দিয়ে যেত।
আল্লাহ তা’আলা এই নারীকে শায়খের করা সেই চমৎকার দু’আর বরকতে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শায়খকে এক গ্লাস পানি পান করানোর উসিলায় রক্ষা করেছিলেন।
তিনি কেবল বলেছিলেন, “হে আমার মেয়ে, আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করুন।”
সুবহানাল্লাহ! তিনি এ কথা বলেননি, “আল্লাহ তোমাকে ধনী করুন, বা স্বাবলম্বী করুন, বা তোমার বিষয়গুলো সহজ করে দিন।”
তিনি বলেছিলেন, “হে আমার মেয়ে, আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করুন।” আর আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গেই তার তাওবা করার তাওফিক দান করলেন!
এটিই শায়খ আলী সুবাই’ رحمه الله এবং (তাওবাকারী সেই নারীর) ঘটনা।
এরপর শায়খ ইবরাহিম رحمه الله বললেন, “আমার শায়খ, আব্দুল-ফাত্তাহ আল-কাদী رحمه الله আমাকে যেভাবে এই ঘটনাটি শুনিয়েছিলেন, আমিও তোমাদের সেভাবেই শোনালাম।”
এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
১. কুরআন ও তাকওয়ার পথের অনুসারীরা আল্লাহর বিশেষ বান্দা, যাদের তত্ত্বাবধান আল্লাহ নিজেই করেন এবং তাদের দু’আ কবুল করেন।
২. এক মুহূর্তের আন্তরিক তাওবা একজন বড় পাপীকে আল্লাহর নেককার বান্দাদের একজনে পরিণত করতে পারে।
৩. তাওবার দরজা সর্বদা খোলা, যতক্ষণ না রুহ শরীর থেকে বের হওয়া শুরু করে (অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত)।
৪. যখন কেউ আন্তরিকভাবে তাওবা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, তখন আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।
৫. এটি এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, একজন পাপী ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত ব্যক্তি এক মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে তার পরিবার ও সমাজের জন্য রহমতের এক মহান উৎস হয়ে যেতে পারে। এটি আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহ।
৬. আপনার পাপ যত বড়ই হোক না কেন, হালাল পথের সন্ধান করুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। আল্লাহ আপনার জন্য কল্যাণের সমস্ত দরজা খুলে দেবেন।
৭. দু’আর শক্তিকে খাটো করে দেখবেন না। উপায় অবলম্বন করুন এবং আল্লাহর কাছে চান।
৮. আপনি যেভাবে পারেন, কুরআনের বাণী প্রচারে সাহায্য করুন। যেমন, যদি আপনি কুরআন শেখাতে না পারেন, তবে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র ও অভাবী শিক্ষক, ছাত্র এবং সংশ্লিষ্টদের জন্য খরচ করুন, যাতে আপনিও সওয়াবের অংশীদার হতে পারেন।








No Comment! Be the first one.