সম্পদের বৈষম্য
রিবা বা সুদের কারণে সম্পদের বৈষম্য তৈরি হওয়া আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এটি মূলত ধনী এবং ঋণদাতাদের বেশি উপকারে আসে, অথচ কম আয়ের ঋণগ্রহীতাদের জন্য এটি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতাকে নিচের পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:
সম্পদের সঞ্চয়:
যাঁদের হাতে পুঁজি আছে এবং যারা সুদভিত্তিক সম্পদ যেমন বন্ড, শেয়ার বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করতে পারেন, তাঁরা সময়ের সাথে সুদের মাধ্যমে আয় করে ক্রমাগত আরও ধনী হয়ে ওঠেন। এই আয় তারা আবার পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারেন, যার ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় চক্রবৃদ্ধি হারে। বিপরীতে, নিম্ন আয়ের ঋণগ্রহীতারা সাধারণত এই ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ পান না, ফলে তাঁদের পক্ষে সম্পদ গড়ে তোলা কঠিন হয়।
ঋণের বোঝা:
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষেরা যখন সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ করেন, তখন তারা অনেক সময়ই ঋণের চক্রে আটকে যান। সুদের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে মূল ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় শুধু সুদের টাকা পরিশোধ করতেই আবার নতুন ঋণ নিতে হয়, যার ফলে ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায় এবং সেই চক্র থেকে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
শোষণমূলক ঋণপ্রদান পদ্ধতি:
কিছু ঋণদাতা উচ্চ সুদের হার ও প্রতিকূল শর্তে ঋণ দিয়ে শোষণমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়, বিশেষত যারা আর্থিকভাবে দুর্বল এবং ঋণের জটিলতা ভালোভাবে বোঝে না, তাদেরকে লক্ষ্য করে। বর্তমান সময়ে BNPL (Buy Now Pay Later) ঋণের বিস্তারও এর উদাহরণ। এ ধরনের শর্ত ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটায় এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়ায়।
সুযোগের অপচয়:
যাঁরা উচ্চ সুদের ঋণে জর্জরিত, তাঁদের আয়ের বড় অংশ কেবল সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যায়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা উন্নতির জন্য বিনিয়োগ করার মতো তহবিল থাকে না। এতে করে দরিদ্রতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সম্পদের বৈষম্য আরও গভীর হয়।
অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি:
ঋণ ও অপরাধের মাঝে একটি দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ঋণ আদায়ের সময় অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়। সম্পদের অসম বণ্টন ও আর্থসামাজিক অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা অনেককে অপরাধে ঠেলে দেয়, বিশেষত যারা নিজেদের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মনে করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কারাবন্দিদের অধিকাংশই ঋণে জর্জরিত। এই অপরাধ প্রবণতা সমাজে ভাঙন সৃষ্টি করে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা হ্রাস করে।
অতিরিক্ত ঋণের বোঝা:
উচ্চ সুদের হার অনেক সময় ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পরিশোধ কঠিন করে তোলে। স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চসুদের ঋণ যেমন ‘পেডে লোন’ এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে, যা অনেক সময় ঋণগ্রহীতার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মুদ্রাস্ফীতি:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন ঋণ ও খরচ উৎসাহিত করতে সুদের হার কমিয়ে দেয়, তখন পণ্যের চাহিদা বাড়ে, যা মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণ হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, বিশেষ করে যাঁরা স্থির আয়ে জীবনযাপন করেন বা সঞ্চয়ের উপর নির্ভর করেন, তাঁদের জন্য এটি কষ্টকর হয়ে ওঠে।
সঞ্চয়ে অনাগ্রহ:
কম সুদের হার মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, কারণ ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব বা অন্যান্য সুদভিত্তিক সম্পদ থেকে যা আয় হয় তা মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পারে না। ফলে মানুষ বেশি লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়ে এবং অনেক সময় আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়।
কৃত্রিম সম্পদ বলয়:
কম সুদের হার অতিরিক্ত ঋণগ্রহণে উৎসাহ দেয় এবং এর ফলে কৃত্রিম সম্পদে বলয় সৃষ্টি হতে পারে, যেমন ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় আবাসন বাজারে দেখা গেছে। মানুষ তখন রিয়েল এস্টেটসহ অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়ে, ফলে মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়ে এবং বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
সম্পদের অপব্যবহার:
সুদের হার বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কম সুদের হারে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঋণ নেয় এবং অপ্রয়োজনীয় বা অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে। এর ফলে সম্পদের অপচয় হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির মন্থরতা দেখা দেয়।
স্বল্পমেয়াদি মনোভাব:
উচ্চ সুদের হার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের প্রবণতা বাড়ায়। এতে তারা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, উদ্ভাবন, অবকাঠামো নির্মাণ বা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে পারে না। এই ধারা একটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
সুদের বিধান ও এর হিকমাহসমূহ
কুরআন ও নবি ﷺ-র বাণীতে বহুবার সুদের বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সুদ গ্রহণ ও প্রদান—উভয়কেই একটি মারাত্মক গোনাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিবা হারাম করে ইসলাম বহু দূরগামী কল্যাণ নিশ্চিত করেছে, যেমন:
- লেনদেনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
- অবিচার ও অসম লেনদেন থেকে সম্পদ রক্ষা করা।
- দান, সহানুভূতি এবং আর্থিক দায়িত্ববোধ উৎসাহিত করা।
- আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা হ্রাস করা, যা সামাজিক শত্রুতা, অবিশ্বাস ও ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
শরিয়তের নীতিমালা ব্যক্তির মধ্যে আরও ন্যায়সংগত ও সুবিচারপূর্ণ লেনদেন গড়ে তুলতে চায় এবং সমাজের সব স্তরের মাঝে সম্পদ বণ্টন উৎসাহিত করে। এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো যাকাত, যা এ ধারণা বহন করে যে সম্পদ সমাজের সব সদস্যের জন্য প্রবাহমান ও সহজলভ্য হওয়া উচিত। এই বিষয়টি নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত:
ইসলামে সম্পদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং যাঁদের হাতে এটি রয়েছে তাঁদের দায়িত্ব হলো তা এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে সমাজ উপকৃত হয়। যাকাতের বিধান মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সম্পদ কেবল নিজেদের কাছে জমা করে রাখা উচিত নয়, বরং এর একটি অংশ দরিদ্র ও প্রয়োজনীয়দের মাঝে বণ্টন করা উচিত।
২. সম্পদ জমা করে রাখার নিরুৎসাহন:
যাকাত মানুষের মধ্যে সম্পদ জমা করে রাখার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে, কারণ এতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর একটি নির্ধারিত অংশ গরিবদের মাঝে বিতরণ করতে হয়। এই প্রথা নিশ্চিত করে যে সম্পদ সবসময় সমাজে প্রবাহমান থাকে, অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখে এবং সকলের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।
৩. সম্পদের পুনর্বণ্টন:
যাকাত মুসলমানদেরকে প্রতি বছর তাদের নির্ধারিত সম্পদের একটি অংশ গরিব ও দরিদ্রদের মাঝে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই নিয়ম সমাজে সম্পদের পুনর্বণ্টনে সহায়তা করে, দরিদ্রদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে এবং ধনীদের মাঝে সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ হ্রাস করে। শরিয়তের এই উদ্দেশ্যটি সূরা হাশরের আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
لَا يَكُونَ دُولَةًۢ بَيْنَ ٱلْأَغْنِيَآءِ مِنكُمْ
“যেন তা (সম্পদ) কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।” [সূরা হাশর: ৭]
ইসলামে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে কঠিন সতর্কবার্তা রয়েছে।
ٱلَّذِينَ يَأْكُلُونَ ٱلرِّبَوٰا۟ لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ ٱلَّذِى يَتَخَبَّطُهُ ٱلشَّيْطَـٰنُ مِنَ ٱلْمَسِّ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوٓا۟ إِنَّمَا ٱلْبَيْعُ مِثْلُ ٱلرِّبَوٰا۟ ۗ وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلْبَيْعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰا۟ ۚ فَمَن جَآءَهُۥ مَوْعِظَةٌۭ مِّن رَّبِّهِۦ فَٱنتَهَىٰ فَلَهُۥ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ أَصْحَـٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَـٰلِدُون
“যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচা-কেনা সুদের মতই। অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।” [সূরা বাকারা: ২৭৫]
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَذَرُوا۟ مَا بَقِىَ مِنَ ٱلرِّبَوٰٓا۟ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ٢٧٨ فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا۟ فَأْذَنُوا۟ بِحَرْبٍۢ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ۖ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَٰلِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং যদি তোমরা প্রকৃত মু’মিন হও, তবে সুদের যে অংশ বাকী আছে তা ছেড়ে দাও। যদি না করো, তবে জেনে রাখো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা রয়েছে। আর যদি তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে—তোমরা জুলুম করবে না, আর তোমাদের উপরও জুলুম করা হবে না।” [সূরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯]
“সুদ একটি অভিশাপ, আর যদি তোমরা তা না ছাড়ো, তবে জেনে রাখো— এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।” [মুসনাদ আহমদ]
আল্লাহ স্পষ্টভাবে সুদের লেনদেন, তা গ্রহণ বা প্রদান—উভয়কেই নিষিদ্ধ করেছেন। এটি আল্লাহর অসীম হিকমাহর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত, যিনি জানেন কোন বিষয় মানবজাতির ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের জন্য উপযুক্ত। নিচে কিছু সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করা হলো, যার মাধ্যমে বোঝা যায় কেন রিবা হারাম:
- সুদের ধ্বংসাত্মক প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো জাতিকেই ধ্বংস করতে পারে। অনেক দেশের বৈদেশিক ঋণ এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে সুদ পরিশোধ করাই তাদের অর্থনীতির ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঋণদাসত্ব ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে, কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যে ঋণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬.২ মিলিয়ন শিশু দারিদ্র্য ও ঋণের চাপে প্রাণ হারায়। রিবার প্রভাব ধ্বংসাত্মক, এবং একে দূর করার গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ আরও বেশি।
- রিবা ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির মূল চেতনাকেই লঙ্ঘন করে। এর ভিত্তি হলো স্বার্থপরতা, লোভ এবং মানবতার প্রতি সহানুভূতির অভাব।
- বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির অন্যতম মারাত্মক সমস্যা মুদ্রাস্ফীতিকে রিবা আরও বাড়িয়ে তোলে।
- রিবা এমন এক অন্যায্য ব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে ঋণগ্রহীতা সব ঝুঁকি বহন করে, অথচ ঋণদাতা নিশ্চিত লাভ পায়। এই লাভ কেবল একপক্ষের কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী ব্যবসার সাফল্যে আগ্রহী না হয়ে কেবল লাভের নিশ্চয়তা খোঁজে, যা ব্যবসায়িক নৈতিকতাকে ধ্বংস করে।
- রিবার নিষ্ঠুর ব্যবস্থা সমাজে একচেটিয়ার চক্র তৈরি করে, ধনীরা আরও ধনী হয় আর দরিদ্ররা ঋণের বোঝা ও মূল্যবৃদ্ধির ভার বইতে বাধ্য হয়।
- সমাজে জমে থাকা ঋণ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা ব্যক্তিকে উদ্বেগ, হতাশা ও চূড়ান্ত দুর্বিষহ অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
আমাদের চারপাশে কোথায় রিবা দেখতে পাই?
সুদভিত্তিক পার্সোনাল লোন (ব্যক্তিগত ঋণ)
কোনো বড় মাপের কেনাকাটা করতে গেলে সাধারণত একজন ব্যক্তি পারিবারিক বা বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে ঋণ নেয়, কিংবা ব্যাংক থেকে সরাসরি পার্সোনাল লোন নেয় অথবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করে, কিংবা অন্য কোনো ক্রেডিট সুবিধার ওপর নির্ভর করে। এই অনিরাপদ (unsecured) ঋণের অর্থ ব্যবহার করে কেউ যেকোনো সম্পদ কিনতে পারে—যেমন আমাদের ক্ষেত্রে একটি গাড়ি—এবং এই ঋণের একটি পৃথক দায়বদ্ধতা থেকে যায় ঋণদাতা বা ক্রেডিটরের কাছে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, যেকোনো উৎস থেকে এমন কোনো ঋণ গ্রহণ করা, যা সুদসহ ফেরত দিতে হয়—চাই তা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক হোক বা সুদভিত্তিক ঋণদাতা—এবং তা যেকোনো উদ্দেশ্যে হোক, নিরাপদ হোক বা না হোক—সবই সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এটি একটি সম্পূর্ণ সুদভিত্তিক চুক্তির সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ।
হোম মর্টগেজ (বাড়ির ঋণ)
হোম মর্টগেজ হলো একটি সুদভিত্তিক এককালীন ঋণ, যা আবাসন বা জমি কেনার জন্য দেওয়া হয়—ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। এই ঋণ ব্যক্তির বাড়ির মূল্যকে জামানত হিসেবে রেখে দেওয়া হয় যতক্ষণ না ঋণ পরিশোধ সম্পূর্ণ হয়। ফলে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক অন্তত কিছু টাকা উদ্ধার করতে পারে।
ফিনান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটির (FCA) তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে আগামী দুই বছরে প্রায় ৭,৫০,০০০টি পরিবার হোম মর্টগেজ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং প্রায় ৪৭,০০০ পরিবার মর্টগেজ বন্দিত্বে (mortgage prisoners) আটকে রয়েছে।
FCA প্রধান বলেন, “আমরা এই গোষ্ঠীর উপর ফোকাস করেছি কারণ মর্টগেজ বন্দিদের বেশিরভাগেরই ঋণ সেইসব প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হয়েছিল যারা এখন আর নতুন গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে না এবং এসব ঋণ অধিকাংশই ২০০৮/০৯ সালের আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।”
ঋণদাতা বা ব্রোকার সাধারণত ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থার উপর একটি পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা যাচাই শুরু করে এবং ‘স্ট্রেস টেস্ট’ এর মাধ্যমে যাচাই করে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে এই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে, যেখানে এক বড় কারণ ছিল ‘NINJA loan’ দেওয়া—যার অর্থ হলো, “No Income, No Job or Assets”—যাতে আর্থিক যাচাই না করেই বড় পরিমাণ ঋণ দেওয়া হতো, এটি জানা সত্ত্বেও যে ঋণগ্রহীতা তা পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে।
এই ধরনের ঋণ আগেরটির মতোই সুদভিত্তিক ঋণের শ্রেণিতে পড়ে এবং এটিও একটি বিশুদ্ধ রিবা চুক্তি হিসেবে গণ্য হয়।
গাড়ির ফাইন্যান্স (Car Finance)
নতুন এবং পুরাতন গাড়ি কেনার জন্য ঋণের পরিমাণ বছরে £৪০ বিলিয়নে পৌঁছেছে, যা নিয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় দেখে অনেকে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে। The Car Expert-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে গাড়ি ফাইন্যান্স ঋণ ২০০৯ সালের পর থেকে £২৯ বিলিয়ন বেড়েছে।
প্রায় ৯২% নতুন গাড়ি এখন ফাইন্যান্স চুক্তির মাধ্যমে কেনা হয়, পাশাপাশি ব্যবহৃত গাড়ির ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যার মানে হলো হাজার হাজার মালিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
The Car Expert আরও জানায়, প্রতি নতুন গাড়ির জন্য গড় ঋণের পরিমাণ ২০০৯ সালের শুরুর দিকে £১২,০০০ থেকে বেড়ে ২০২২ সালের জুনের শেষে দাঁড়িয়েছে £২৫,০০০-এ, যা দ্বিগুণেরও বেশি।
বেশিরভাগ গাড়ি ফাইন্যান্স চুক্তি ত্রিপক্ষীয় হায়ার পারচেজ চুক্তির আওতায় পড়ে। এ চুক্তিতে ক্রেতা তৃতীয় পক্ষ (সাধারণত একটি ফাইন্যান্স সংস্থা) থেকে অর্থ ধার নিয়ে বিক্রেতার কাছ থেকে গাড়ি কিনে। তৃতীয় পক্ষ সেই ঋণ গাড়ির উপর জামানত রেখে দেয় এবং ক্রেতা মূল অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করে। যদি এই হায়ার পারচেজ চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় না হয়, তাহলে এরূপ ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ ইসলামি দৃষ্টিতে অবৈধ হবে। তবে ভালো খবর হলো—বিপরীতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, লিজ বা পিসিপি (Personal Contract Purchase)-এর মতো অনেক হালাল বিকল্প রয়েছে।
ওভারড্রাফট (Overdraft)
ব্যাংকগুলো ওভারড্রাফটের উপর চার্জকৃত ফি থেকেই বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করে থাকে এবং এই চার্জগুলো সর্বদা স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হয় না। অনেক সময় এই লুকানো এবং শোষণমূলক ফি-গুলো পরিবারের ব্যাংক হিসাবের উপর বড় প্রভাব ফেলে। তাই এগুলো বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ২০২২ সালের মে ও জুন মাসে ওভারড্রাফট ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা মিলে গিয়েছিল সেই সময়ের বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির সময়সীমার সাথে। ব্যাংকগুলো ওভারড্রাফটের উপর সুদ ধার্য করে থাকে, যা সময় বাড়ানোর বিনিময়ে আরোপিত সুদ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ঋণ-ভিত্তিক লেনদেনে রিবা (Riba al-Duyun) এর অন্তর্ভুক্ত।
ক্রেডিট কার্ড
নভেম্বর মাসে ৩৫৫.১ মিলিয়ন ক্রেডিট কার্ড লেনদেন সংঘটিত হয়েছে, যা ২০২১ সালের নভেম্বরের তুলনায় ০.৩% বেশি। মোট ব্যয় ছিল £১৯.৬ বিলিয়ন, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫.৩% বেশি।
ক্রেডিট কার্ড অ্যাকাউন্টের বকেয়া ব্যালেন্স গত বারো মাসে ৯.৪ শতাংশ বেড়েছে। এই বকেয়া ব্যালেন্সের মধ্যে ৫০.৯ শতাংশ সুদ-আরোপিত হয়েছে, যেখানে বারো মাস আগে তা ছিল ৫২.৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানগুলো ক্রমবর্ধমান ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়, বিশেষত যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের ক্রেডিটের ওপর নির্ভরতা এমন অনেক পরিবারকে ঋণের চক্রে ফেলে দিচ্ছে, যারা প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিল পরিশোধের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছে। তারা একদিকে যেমন ঋণ শোধে ব্যস্ত, তেমনি জীবনযাপনের খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে—ফলে তাদের ঋণ শোধের পরিমাণও বাড়তে থাকে, যা সময়ের সাথে আরও কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি ডিফল্ট করার সম্ভাবনাও বাড়ে।
ক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মাঝে সুদমুক্ত সময়ের সুবিধা দিতে পারে; কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা সময় বাড়ানোর জন্য অর্থ আদায় করে থাকে, যা ঋণ পরিশোধে বিলম্বের বিনিময়ে আরোপিত সুদের শামিল। এটি ইসলামি পরিভাষায় ঋণভিত্তিক লেনদেনে রিবা (Riba al-duyun) হিসেবে গণ্য হয়।
BNPL (Buy Now Pay Later)
“এখন কিনো, পরে পরিশোধ করো” পদ্ধতি বা BNPL সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি করেছে। এই পদ্ধতি মানুষকে এমনসব পণ্য বা ছুটি কাটানোর পেছনে ব্যয় করতে উৎসাহিত করছে, যা বাস্তবে তাদের সামর্থ্যের বাইরে। Gen Z ব্যবহারকারীরা (১৮-২৪ বছর বয়সীরা) BNPL ব্যবহার করছে যেন তারা ফ্যাশন ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আরেকটি সাধারণ ব্যবহার হলো—অন্য ঋণ থেকে তৈরি মানসিক চাপ সামাল দিতে এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করা।
FCA (Financial Conduct Authority) বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করেছে এবং ঋণদাতাদের ক্ষতিকর নীতিগুলো পর্যালোচনা করে দিকনির্দেশনা প্রদানের চেষ্টা করছে।
BNPL ব্যবস্থাগুলোতে অনেক সময় এমন শর্ত থাকে যে, সর্বনিম্ন পরিশোধ করা না হলে অথবা নির্ধারিত সুদমুক্ত সময়ের মধ্যে ঋণ শোধ না করলে সুদ আরোপ করা হবে। এটি এমন এক লেনদেনের উদাহরণ, যেখানে পরিশোধের সময় বাড়ানোর বিনিময়ে সুদ আদায় করা হয়—এবং এটি রিবা আল দুইয়ুন এর প্রকৃত সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
শেষ কথা (Closing Words)
উপসংহার হিসেবে বলা যায়, রিবার ধারণা, যা ইসলামি শিক্ষার মূলভিত্তিতে রয়েছে, তা ন্যায়সঙ্গত আর্থিক প্রথা গড়ে তোলার গুরুত্ব ও অন্যায় লাভ নিরুৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। যদিও আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাগুলো এখন ব্যাপকভাবে সুদভিত্তিক লেনদেনকে গ্রহণ করেছে, তবুও রিবার যে মূল সমস্যা—তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজ যখন আমরা সুদনির্ভর অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব, যেমন সম্পদের বৈষম্য, অসহনীয় ঋণের বোঝা ও আর্থিক সংকট দেখতে পাচ্ছি—তখন এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আমাদের বিকল্প অর্থনৈতিক পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। রিবা নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনের নীতিমালাগুলো পুনর্বিবেচনা করে আমরা এমন এক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি যা আরও ন্যায়সঙ্গত, নৈতিক এবং টেকসই, যেখানে ন্যায়বিচার, ঝুঁকির ভাগাভাগি এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
রিবা গ্রহণ আমাদের দোয়ার কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল্লাহর রাসূল ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যিনি তাঁর হাত আকাশের দিকে বাড়িয়ে দোয়া করছেন, এবং তিনি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন—
“যার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং যে (এমন) হারাম দ্বারা লালিত-পালিত—তার দোয়া কিভাবে কবুল হবে?”
রিবার সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলোকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও ন্যায্য ও স্থিতিশীল একটি বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি।








No Comment! Be the first one.