নবি করিম ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউই পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার সন্তানের চেয়ে, তার পিতার চেয়ে এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।” [বুখারি]
এই হাদিসটি আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে এবং সম্প্রতি আমাদের এক আলোচনায় যাইদ ইবনে হারিসাহ رضي الله عنه –এর ঘটনা উঠে এসেছিল। তার জীবন এই হাদিসের একটি বাস্তব, জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
যাইদ কে ছিলেন?
যাইদ ইবনে হারিসাহ ছিলেন ইয়েমেনের কাহতানি বংশের একজন। তার পিতা ও মাতা ছিলেন দুটি ভিন্ন গোত্রের, যাদের মাঝে ভালোবাসা ও বিরোধ দুটোই বিদ্যমান ছিল। একদিন যাইদের মা সু’দাহ বিনতে সা’লাবাহ তার সাত বা আট বছর বয়সী পুত্রকে নিজের গোত্রে নিয়ে যান। ঠিক সে সময়ে তার পিতৃগোত্র ও মাতৃগোত্রের মধ্যে একটি ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটে যায়। এতে তার মায়ের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়রা এতটাই ক্ষিপ্ত হয় যে, তারা প্রতিশোধ নিতে যাইদকে অপহরণ করে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয় — কারণ জাহিলিয়ার যুগে সন্তানের পরিচয় পিতার দিক দিয়েই নির্ধারিত হতো।
তাকে বিক্রি করা হয়েছিল উক্কায (ওকায) নামক বিখ্যাত হজ্জ-পরবর্তী মেলায়, যা ছিল আরবের সবচেয়ে বড় বাজার।
হযরত ইউসুফ عليه السلام–এর মতোই, যাইদ ইবনে হারিসাহ رضي الله عنه–কেও অন্যায়ভাবে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল — মাত্র ৪০০ দিরহামের বিনিময়ে। তাকে কিনে নেন হাকিম ইবনে হিজাম, যিনি ছিলেন খাদিজাহ رضي الله عنها–এর ভাতিজা। হাকিম যখন মক্কায় পৌঁছান, তখন তিনি যাইদকে তার ফুফুকে উপহার দেন। পরে খাদিজাহ رضي الله عنها নবি করিম ﷺ–এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে, তিনি যাইদকে উপহার দেন রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে।
অন্যদিকে, যাইদের পিতা এখনও তার নিখোঁজ পুত্রকে খুঁজে ফিরছিলেন। একদল মক্কাফেরত বণিক যাইদকে চিনে ফেলেন এবং তার পিতাকে এ খবর দেন। সঙ্গে সঙ্গে যাইদের পিতা এবং চাচা মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মক্কায় এসে তারা নবি করিম ﷺ–এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, তারা তাদের ছেলেকে মুক্ত করতে চান এবং এর বিনিময়ে মুক্তিপণ দিতে প্রস্তুত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তরে বললেন, “আমি সিদ্ধান্ত যাইদের উপর ছেড়ে দেব। যদি সে তোমাদের সাথে যেতে চায়, তাহলে কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই যেতে পারবে। আর যদি সে আমার সাথেই থাকতে চায়, তাহলে তোমাদের সেটা মেনে নিতে হবে।”
এই প্রস্তাবে যাইদের পিতা খুবই আনন্দিত হন। যখন যাইদকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করা হয়, “তুমি কি এ দু’জনকে চিনো?” — তখন সে বলে, “হ্যাঁ, উনি আমার পিতা আর উনি আমার চাচা।” এরপর তাকে তার মুক্তির প্রস্তাব জানানো হয়। তখন যাইদ বললেন:
“আমি কখনোই আপনাকে (নবি করিম ﷺ) ছেড়ে যাব না। আমি কিছুতেই এই দুনিয়ার বিনিময়ে আপনাকে ছেড়ে যেতে পারি না।”
তার ছেলের এই জবাব শুনে হারিসাহ বিস্মিত ও স্তম্ভিত হন যে, তার ছেলে একজন মুক্ত মানুষ হয়ে নিজ গোত্রে ফিরে না গিয়ে দাস হিসেবে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। পিতার মন শান্ত করার জন্য, নবি করিম ﷺ যাইদের হাত ধরে কাবার কাছে যান এবং ঘোষণা দেন যে, তিনি যাইদকে দত্তক নিয়েছেন। এখন থেকে সে হবে যাইদ ইবনে মুহাম্মদ, এবং সে আমার কাছ থেকে উত্তরাধিকার পাবে এবং আমিও তার কাছ থেকে উত্তরাধিকার পাব।
- যাইদ ইবনে হারিসাহ رضي الله عنه ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম দিকের ব্যক্তিদের একজন।
- যাইদ رضي الله عنه নবি করিম ﷺ–এর ঘরেই নিজের ছেলের মতো বড় হয়েছেন। ইবনে উমর رضي الله عنه বলেন, “আমি যাইদকে শুধু যাইদ ইবনে মুহাম্মদ হিসেবেই জানতাম যতক্ষণ না এই আয়াত নাজিল হলো: ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামে ডাকো।” [আহমদ]
এটি আমাদের দেখায় নবি করিম ﷺ তাকে কতোটা ভালোবাসতেন এবং তার সাথে কীভাবে আচরণ করতেন। - যাইদ رضي الله عنه তাঁর জীবনে অন্তত তিনজন, সম্ভবত পাঁচজন স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন উম্মু আইমান, যিনি ছিলেন নবি করিম ﷺ–এর পিতা আবদুল্লাহর ক্রীতদাসী। যখন তাদের ঘরে উসামা জন্মগ্রহণ করেন, তিনি নবি করিম ﷺ–এর ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এই বরকতময় ঘরে হাসান ও হুসাইন رضي الله عنهم–এর সান্নিধ্যে বড় হন।
- উসামা رضي الله عنه নবি করিম ﷺ–এর অতি প্রিয় ছিলেন, এমনকি তিনি সাহাবিদের মধ্যে “প্রিয়, প্রিয়জনের সন্তান” নামে পরিচিত ছিলেন। সাহাবিরা প্রায়ই উসামাকে নিজেদের অনুরোধ নিয়ে নবি করিম ﷺ–এর কাছে পাঠাতেন। তিনি ছিলেন সেই তিনজনের একজন, যারা নবি করিম ﷺ–এর সঙ্গে কাবায় প্রবেশ করেন।
- যাইদ رضي الله عنه একমাত্র ব্যক্তি যিনি নবি করিম ﷺ–এর সঙ্গে তাইফ সফরে ছিলেন এবং যখন সবাই তাঁকে পরিত্যাগ করে, তখন তিনিই তাঁর পাশে ছিলেন।
- যাইদ رضي الله عنه হলেন একমাত্র সাহাবি যার নাম কুরআনে উল্লেখ আছে (সুরা আল আহযাব, ৩৭) এবং কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমদের মুখে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে।
- যাইদ رضي الله عنه নবি করিম ﷺ–এর পরিবারের সঙ্গে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
- মদিনায় হিজরতের পর, যাইদকে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব رضي الله عنه–এর ভাই বানানো হয়েছিল। বর্ণিত আছে, হামজা তার ওসিয়ত যাইদের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। আত্মীয়তার দিক দিয়ে হামজা যাইদের দাদা হতেন।
- আয়েশা رضي الله عنها বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ যখনই যাইদ ইবনে হারিসাহকে কোনো সেনাদলের সঙ্গে পাঠাতেন, তাঁকে তাদের উপর সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। যদি তিনি নবি করিম ﷺ–এর পরে বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি তাঁকে খলিফা করতেন। [আহমদ]
- নবি করিম ﷺ যখনই মদিনা থেকে বাইরে যেতেন, যাইদ رضي الله عنه–কে মদিনার শাসক নিযুক্ত করে রেখে যেতেন।
- উমর رضي الله عنه তাঁর খিলাফতের সময় উসামাকে ৩৫০০ দিরহাম ভাতা দিতেন, আর তাঁর নিজের ছেলে আবদুল্লাহকে ৩০০০ দিরহাম। আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলে কেন এই ভিন্নতা, যদিও তিনি যুদ্ধে আগে অংশ নিয়েছিলেন, উমর বলেন, “কারণ যাইদ আল্লাহর রাসূলের কাছে তোমার পিতার চেয়েও প্রিয় ছিলেন, আর উসামা আল্লাহর রাসূলের কাছে তোমার চেয়েও প্রিয় ছিলেন। তাই আমি আল্লাহর রাসূলের প্রিয়কে নিজের প্রিয়দের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছি।” [তিরমিজি]
- যাইদ رضي الله عنه ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ যোদ্ধা ও তীরন্দাজ। তিনি ৮ হিজরিতে মুতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে শহিদ হন। তখন তার বয়স ছিল ৫৫ বছর।
এই ঘটনাগুলো আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
যখন আমাদের সামনে সুন্নাহ বা ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা আসে, তখন আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া জানাই? আমরা কি তা মেনে নেই, নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করি? নাকি বলি, “আমাদের বাবা-দাদা তো এইভাবে করতেন, তারা কি ভুল করতে পারেন?” — এই কথা বলে আমরা পরিবর্তন অস্বীকার করি?
আসুন আমরা নিজেদের নিয়ে ভাবি, এবং নিজের আমল ও মনোভাবকে সংশোধন করি।








No Comment! Be the first one.